দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামে রাজপথে থাকা নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন, নতুনদের উত্থান এবং সাংগঠনিক পদ-পদবি এই তিন বিষয়কে ঘিরে নারায়ণগঞ্জ বিএনপির তৃণমূলে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। দলের কঠিন সময়ে যারা মাঠে ছিলেন, তাদের একটি অংশ এখন সাংগঠনিক মূল্যায়ন নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। অন্যদিকে সাম্প্রতিক সময়ে রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়া নতুন মুখগুলোর একটি অংশও বিভিন্ন পর্যায়ে দৃশ্যমান হয়ে উঠেছেন।
নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন ইউনিটের নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বিএনপির সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। জেলা ও মহানগর পর্যায়ে নতুন নেতৃত্বের পাশাপাশি থানা, পৌরসভা ও ওয়ার্ড পর্যায়েও কমিটি পুনর্গঠন হয়েছে। ফলে দীর্ঘদিনের নেতাকর্মীদের পাশাপাশি নতুনদের মধ্যেও নেতৃত্বে আসার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।
সম্প্রতি বন্দর উপজেলা বিএনপির একাংশের নেতাকর্মীদের মধ্যে ত্যাগী নেতাদের যথাযথ মূল্যায়ন না হওয়ার অভিযোগ প্রকাশ্যে এসেছে। তাদের দাবি, দীর্ঘদিন দলের সঙ্গে থাকা নেতাকর্মীদের তুলনায় নতুন ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের গুরুত্ব বাড়ছে।
একই ধরনের আলোচনা দেখা গেছে নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপিতেও। ত্যাগী ও নতুন/সুবিধাভোগী হিসেবে পরিচিত নেতাকর্মীদের নিয়ে দলীয় পর্যায়ে বিতর্কের কথা উঠে এসেছে।
বিএনপির তৃণমূলের দীর্ঘদিনের নেতাকর্মীদের একটি অংশের বক্তব্য, দল যখন বিরোধী অবস্থানে ছিল তখন মামলা, গ্রেপ্তার, হামলা ও নানা চাপের মধ্যেও তারা মাঠে ছিলেন। এখন দল ক্ষমতার বাইরে থেকেও সাংগঠনিকভাবে শক্ত অবস্থানে আসার প্রক্রিয়ায় তাদের অনেকেই প্রত্যাশিত মূল্যায়ন পাচ্ছেন না—এমন অভিযোগ রয়েছে।
তাদের প্রশ্ন, দলের দুঃসময়ে যারা মাঠে ছিলেন, সাংগঠনিক পদ দেওয়ার সময় তাদের রাজনৈতিক ভূমিকা কতটা বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে?
তবে অন্যদিকে দলের নতুন প্রজন্মের নেতাদের বক্তব্য—শুধু অতীতের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নয়, বর্তমান সময়ে সাংগঠনিক দক্ষতা, মাঠে সক্রিয়তা, নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতা এবং নতুন কর্মীদের সংগঠিত করার যোগ্যতাও বিবেচনায় থাকা প্রয়োজন।
নারায়ণগঞ্জ বিএনপির বিভিন্ন ইউনিটে নতুন কমিটি গঠনের মধ্য দিয়ে নতুন নেতৃত্বের সুযোগ তৈরি হয়েছে। জেলা বিএনপির আওতাধীন পাঁচটি থানা ও পাঁচটি পৌরসভায় ৩১ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি অনুমোদনের খবরও প্রকাশিত হয়েছে।
মহানগর বিএনপিতেও নতুন আহ্বায়ক কমিটি গঠনের মাধ্যমে নেতৃত্বের কাঠামোয় পরিবর্তন এসেছে। ৪১ সদস্যের কমিটিতে সাখাওয়াত হোসেন খানকে আহ্বায়ক এবং আবু আল ইউসুফকে সদস্যসচিব করা হয়েছে।
ফলে এখন প্রশ্ন উঠছে নতুন কমিটিগুলোতে পুরনো ত্যাগী নেতাদের কতটা জায়গা মিলছে এবং নতুন প্রজন্মের নেতৃত্ব কতটা জায়গা করে নিচ্ছে?
তৃণমূলের নেতাকর্মীদের অনেকের মতে, কমিটিতে পদ পাওয়া আর মাঠে সক্রিয় থাকার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। কোনো নেতা কত বছর দলের সঙ্গে ছিলেন, তার পাশাপাশি বর্তমানে তিনি কর্মীদের সঙ্গে কতটা যোগাযোগ রাখছেন, সাংগঠনিক কর্মসূচিতে কতটা সক্রিয় এবং স্থানীয় পর্যায়ে কর্মীদের কতটা সংগঠিত করতে পারছেন—এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
এদিকে নারায়ণগঞ্জে ছাত্রদলের সাংগঠনিক কার্যক্রম নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে হতাশার কথা প্রকাশ পেয়েছে। কমিটি না থাকায় তরুণ ও পদপ্রত্যাশী নেতাকর্মীদের একটি অংশ সাংগঠনিক পরিচয় ও নেতৃত্বের সুযোগ নিয়ে অনিশ্চয়তার কথা জানিয়েছেন।
নারায়ণগঞ্জ বিএনপির জন্য এখন বড় প্রশ্ন হলো দলের পুরনো ত্যাগী নেতাদের অভিজ্ঞতা এবং নতুন প্রজন্মের নেতৃত্বকে কীভাবে একই সাংগঠনিক কাঠামোর মধ্যে কাজে লাগানো হবে।
একদিকে ত্যাগীদের মূল্যায়নের দাবি, অন্যদিকে নতুনদের নেতৃত্বে আসার আকাঙ্ক্ষা দুই পক্ষের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করাই এখন সাংগঠনিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তবে ত্যাগী কিংবা নতুন কাকে কতটা মূল্যায়ন করা হচ্ছে, তা নির্ধারণে শুধু অভিযোগ বা রাজনৈতিক পরিচয়ের ওপর নির্ভর না করে দলীয় পদ, অতীতের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, মামলা-হামলার নথি, সাম্প্রতিক কর্মসূচিতে উপস্থিতি এবং সংশ্লিষ্ট নেতাদের বক্তব্য যাচাই করেই চূড়ান্ত চিত্র পাওয়া সম্ভব।
নারায়ণগঞ্জ বিএনপির তৃণমূলে তাই এখন আলোচনার বিষয় একটাই—
‘দুঃসময়ের ত্যাগ কি নেতৃত্বের মাপকাঠি হবে, নাকি নতুন সময়ের সক্রিয়তাই নির্ধারণ করবে ভবিষ্যতের নেতৃত্ব?’

