শিল্পনগরী নারায়ণগঞ্জে চাঁদাবাজির বিস্তার নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ বাড়ছে। পরিবহন, শিল্পাঞ্চল, কাঁচাবাজার, ফুটপাত, হকার নিয়ন্ত্রণ, ঘাট, নির্মাণ খাত থেকে শুরু করে বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ দীর্ঘদিনের হলেও সাম্প্রতিক সময়ে তা আরও প্রকাশ্যে চলে এসেছে বলে দাবি করছেন ব্যবসায়ী ও স্থানীয়রা। রাজনৈতিক পরিচয়কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে একাধিক চক্র সক্রিয় রয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, জেলার বিভিন্ন এলাকায় চাঁদাবাজদের একটি তালিকা প্রস্তুতের কাজ চলছে। থানা পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট অভিযোগ যাচাই-বাছাই করে তথ্য সংগ্রহ করছে। শুধু ব্যক্তি নয়, চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত পুরো নেটওয়ার্ক, অর্থের উৎস এবং সহযোগীদেরও শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। তবে এখন পর্যন্ত বড় ধরনের দৃশ্যমান অভিযান শুরু না হওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, অতীতেও একাধিকবার চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে অভিযান ও তালিকা তৈরির ঘোষণা এলেও সময়ের সঙ্গে তা শিথিল হয়ে পড়ে। ফলে কিছুদিন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকলেও পরে আবার সক্রিয় হয়ে ওঠে চক্রগুলো। এবারও তারা শুধু ঘোষণায় নয়, মাঠপর্যায়ে কার্যকর পদক্ষেপ দেখতে চান।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সময়ে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপির ওপর জনগণের প্রত্যাশাও বেশি। কিন্তু দলের কিছু নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে দখল, চাঁদাবাজি ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ দলটির ভাবমূর্তির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। যদিও অভিযোগ পাওয়া গেলে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বারবার জানিয়েছে দলটির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে।
সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জে চাঁদাবাজির অভিযোগে কয়েকটি ঘটনা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এর মধ্যে চাঁদাবাজির অভিযোগে কয়েকজন রাজনৈতিক নেতার বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ, গ্রেপ্তার এবং দলীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থার ঘটনাও রয়েছে। সিদ্ধিরগঞ্জে চাঁদাবাজির অভিযোগে দুই বিএনপি নেতাকে আটক করে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানোর ঘটনাও আলোচনায় আসে।
এদিকে স্থানীয়দের অভিযোগ, শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় প্রতিদিন বিপুল অঙ্কের চাঁদা আদায় হচ্ছে। পরিবহন স্ট্যান্ড, ফুটপাত, হকার, বাজার ও বিভিন্ন বাণিজ্যিক এলাকায় একাধিক সিন্ডিকেট নিয়মিত চাঁদা আদায় করছে বলে দাবি তাদের। অনেক ভুক্তভোগী নিরাপত্তার কারণে প্রকাশ্যে অভিযোগ করতে চান না।
সম্প্রতি মৌমিতা পরিবহনের একটি পক্ষের পক্ষ থেকে কয়েকজন স্থানীয় বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে চাঁদা দাবির অভিযোগও সামনে এসেছে। বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনেও আলোচনা চলছে। অভিযোগগুলোর বিষয়ে দলীয় ও আইনগত তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
সংশ্লিষ্ট একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, এবার বিচ্ছিন্নভাবে কয়েকজনকে আটক করার পরিবর্তে পুরো চক্রের বিরুদ্ধে সমন্বিত অভিযান পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে। যাতে একজন গ্রেপ্তার হলেও অন্যরা একই কার্যক্রম চালিয়ে যেতে না পারে। এজন্য অভিযোগ যাচাই ও গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
ব্যবসায়ী, নাগরিক সমাজ ও সচেতন মহলের অভিমত, চাঁদাবাজি বন্ধে শুধু তালিকা প্রস্তুত করলেই হবে না প্রয়োজন নিয়মিত অভিযান, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং নিরপেক্ষ আইন প্রয়োগ। তাদের আশা, অভিযানের ঘোষণা বাস্তবে রূপ নিলে শিল্প ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ ফিরে আসবে এবং দীর্ঘদিনের এই সমস্যার স্থায়ী সমাধানের পথ তৈরি হবে।

