জুলাই গণআন্দোলন ও পরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং বিএনপি সরকার গঠন করার পর দেশের বিভিন্ন স্থানের মতো নারায়ণগঞ্জেও জনগণের প্রত্যাশা ছিল দলীয় প্রভাব, চাঁদাবাজি, দখল, সন্ত্রাস এবং রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে অপরাধের সংস্কৃতির অবসান ঘটবে। কিন্তু স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন সময়ে ওঠা অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান এবং রাজনৈতিক বিতর্ককে কেন্দ্র করে জেলার সচেতন মহলে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে দলের ভাবমূর্তি রক্ষায় বিএনপির অভ্যন্তরে আরও কঠোর সাংগঠনিক শুদ্ধি অভিযান প্রয়োজন কি না।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতার পর জনগণ একটি জবাবদিহিমূলক রাজনৈতিক পরিবেশ প্রত্যাশা করছে। এমন পরিস্থিতিতে কোনো দলের নাম ব্যবহার করে অপরাধ সংঘটিত হলে বা দলীয় পরিচয়ে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠলে তার নেতিবাচক প্রভাব পুরো সংগঠনের ওপর পড়ে।
গত বছরের ৫ আগস্টের পর নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় ডাকাতি, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ, দখল ও চাঁদাবাজির অভিযোগ নিয়ে একাধিক সংবাদ প্রকাশিত হয়। এসব ঘটনার কিছুতে বিএনপির নামধারী নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে। আবার অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয়ভাবে দাবি করা হয়, কিছু ব্যক্তি রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে ব্যক্তিস্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করেছে। এসব অভিযোগের অনেকগুলোর তদন্ত এখনও সম্পূর্ণ হয়নি কিংবা আদালতে নিষ্পত্তি হয়নি।
সদর ফতুল্লা বন্দর আড়াইহাজার রুপগঞ্জ উপজেলার কয়েকটি এলাকায় বাড়িঘরে হামলা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগ, বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানে লুটপাটের দাবি এবং কয়েকটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে দখলবাণিজ্যের অভিযোগ স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। একই সময়ে শহরের বিভিন্ন ঘাট, বাস টার্মিনাল, হকার নিয়ন্ত্রণ, অবৈধ স্ট্যান্ড এবং ব্যবসা-বাণিজ্য ঘিরেও চাঁদাবাজি ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ বিভিন্ন মহল থেকে সামনে আসে। এমনও অভেযোগ আছে বিএনপির ক্ষমতায় আসার পর যারা গত ৫ আগষ্টের আগে যে সকল নেতা নিজের পকেট খরচ চালাতে হিমশিম খেত সে সকল নেতারা এখন কোটি কোটি টাকার মালিক হয়ে গেছে ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কিছু ব্যক্তি বিএনপির নাম ব্যবহার করে চাঁদাবাজি, ভূমি দখল, মাদক ব্যবসা কিংবা ব্যবসায়িক আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করছে। আবার বিএনপির নেতাদের একটি অংশের দাবি, এসব ব্যক্তির অনেকে প্রকৃতপক্ষে দলের সক্রিয় কর্মী নন বরং রাজনৈতিক পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য দলের পরিচয় ব্যবহার করছেন। এমন অভিযোগও রয়েছে যে, অতীতে অন্য রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু সুবিধাবাদী ব্যক্তি নতুন বাস্তবতায় নিজেদের পরিচয় বদলে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন।
বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব অতীতেও একাধিকবার দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করেছে। দলীয় কর্মশালা ও বিভিন্ন বক্তব্যে নেতারা জনগণের আস্থা অর্জন, শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়—এমন কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে কেউ অপরাধ করলে তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বিভিন্ন সময়ে বলা হয়েছে।
সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের মতে, কোনো রাজনৈতিক দলের পরিচয় ব্যবহার করে অপরাধ সংঘটিত হলে তা শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়; এটি দলের রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতার সঙ্গেও জড়িত। তাই অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রকৃত অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা এবং নির্দোষ ব্যক্তিদের হয়রানি থেকে রক্ষা—এই তিনটি বিষয় সমান গুরুত্ব পাওয়া প্রয়োজন।
তাদের মতে, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে নেতৃত্ব নির্বাচনে সততা, রাজনৈতিক ত্যাগ এবং সাংগঠনিক গ্রহণযোগ্যতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হলে সুবিধাবাদী ও বিতর্কিত ব্যক্তিদের দলে অনুপ্রবেশ কমবে। পাশাপাশি দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে চাঁদাবাজি, দখল বা সন্ত্রাসের অভিযোগ প্রমাণিত হলে দ্রুত সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়াও জরুরি।
বিশ্লেষকদের অভিমত, জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে হলে রাজনৈতিক দলগুলোকে নিজেদের ভেতর থেকেই জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। নারায়ণগঞ্জে যেসব ঘটনায় বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে, সেগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলে একদিকে যেমন আইনের শাসনের প্রতি জনগণের আস্থা বাড়বে, অন্যদিকে দলীয় ভাবমূর্তিও শক্তিশালী হবে।
তাদের ভাষ্য, রাজনৈতিক পরিচয় নয়—অপরাধের ভিত্তিতেই ব্যবস্থা নেওয়ার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে পারলে জনগণের আস্থা অর্জন সহজ হবে। একই সঙ্গে প্রকৃত ত্যাগী নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন এবং সুবিধাবাদীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানই একটি রাজনৈতিক সংগঠনের দীর্ঘমেয়াদি গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করতে পারে।

