ডেইলি নারায়ণগঞ্জ টুয়েন্টিফোর ডটকমঃ মানুষের জীবনের দীর্ঘতম ও সবচেয়ে গভীর যাত্রার সূচনা হয় মায়ের কোল থেকেই—কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র বা সামাজিক মঞ্চ থেকে নয়। তাই মায়ের কোলই মানুষের প্রথম পাঠশালা, প্রথম মাদরাসা এবং চরিত্র গঠনের প্রাথমিক কেন্দ্র। ইতিহাসে যাঁরা সাফল্যের শিখরে পৌঁছেছেন কিংবা আলোকিত চরিত্র নিয়ে সমাজে আত্মপ্রকাশ করেছেন, তাঁদের জীবনের পেছনে অনুসন্ধান করলে দেখা যায়—একজন নীরব সাধিকার দোয়া, ত্যাগ ও আদর্শ সেখানে গভীরভাবে প্রোথিত। সেই সাধিকাই হলেন মা।
সমসাময়িক সমাজে সন্তান প্রতিপালনকে প্রায়ই খাদ্য, পোশাক, বিদ্যালয় ও কোচিংয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখা হয়। অথচ ইসলাম সন্তান গঠনের যে মৌলিক ভিত্তির কথা বলে, তা কোনো বস্তুগত উপাদান নয়; বরং মায়ের দোয়া ও আদর্শিক উপস্থিতি। এই দুটি শক্তি মিলেই এমন এক অদৃশ্য ভিত নির্মাণ করে, যার ওপর দাঁড়িয়ে একটি মানুষ আজীবন স্থিত থাকে।
ইসলামে দোয়ার গুরুত্ব অত্যন্ত ব্যাপক। তবে কিছু দোয়া রয়েছে, যেগুলো আল্লাহ বিশেষভাবে কবুল করেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তিনটি দোয়া অবশ্যই কবুল করা হয়: মজলুমের দোয়া, মুসাফিরের দোয়া এবং সন্তানের জন্য মা-বাবার দোয়া।’ (আবু দাউদ, হাদিস: ১৫৩৬)
যদিও হাদিসে মা-বাবা উভয়ের কথা বলা হয়েছে, তবে ইসলামী আলেমদের সর্বসম্মত অভিমত হলো—মায়ের দোয়ার প্রভাব তুলনামূলকভাবে আরও গভীর। কারণ গর্ভধারণ, জন্ম, লালন-পালন ও মানসিক গঠনে মায়ের ভূমিকা সবচেয়ে প্রত্যক্ষ এবং দীর্ঘস্থায়ী।
ইবনুল কায়্যিম (রহ.) বলেন, সন্তানের অন্তরের দিকনির্দেশনা মূলত নির্ভর করে তার ঘরে উচ্চারিত দোয়া ও কথাবার্তার ওপর। (তুহফাতুল মাওদূদ)
একজন মা যখন গভীর রাতে অশ্রুসজল চোখে সন্তানের জন্য হিদায়াত, ঈমান ও নিরাপত্তার দোয়া করেন, সেই শব্দ হয়তো শ্রুতির বাইরে মিলিয়ে যায়; কিন্তু তার প্রভাব সন্তানের ভবিষ্যৎ চরিত্রে স্থায়ী ছাপ রেখে যায়।
পবিত্র কোরআনের বহু স্থানে মা-বাবার—বিশেষত মায়ের দোয়ার প্রতিফলন দেখা যায়। ইব্রাহিম (আ.)-এর দোয়া তার অন্যতম উজ্জ্বল উদাহরণ:
‘হে আমার প্রতিপালক! আমাকে সালাত কায়েমকারীদের অন্তর্ভুক্ত করুন এবং আমার বংশধরদেরও।’ (সুরা ইবরাহিম: ৪০)
এই দোয়ার ধারাবাহিক ফল হিসেবেই ইসমাইল (আ.), ইসহাক (আ.) ও পরবর্তী নবীদের জীবনে আমরা তার প্রতিফলন দেখি। আলেমরা বলেন, কখনো কখনো এক প্রজন্মের দোয়া কয়েক প্রজন্ম পর বাস্তবায়িত হয়।
দোয়ার পাশাপাশি মায়ের জীবনাচরণও সন্তানের জন্য শক্তিশালী শিক্ষা হয়ে ওঠে। শিশু প্রথমে কথা শোনে না, বরং দেখে। সে মায়ের নামাজ, কথা বলার ভঙ্গি, ধৈর্য, রাগ সংযম এবং আল্লাহর ওপর নির্ভরতা প্রত্যক্ষ করে। শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ (রহ.) বলেছেন, শিশুর অন্তর কাঁচা মাটির মতো—প্রথমে যা তাতে গড়া হয়, সেটিই স্থায়ী হয়ে যায়। (তুহফাতুল মাওদূদ)
একজন মা যদি নিজের জীবনে সত্যবাদিতা, ধৈর্য, লজ্জাশীলতা ও তাকওয়া ধারণ করেন, তবে সন্তানকে এসব আলাদা করে শেখাতে হয় না—আদর্শ নিজেই শিক্ষা হয়ে ওঠে।
ইতিহাসে তাকালে দেখা যায়, ইমাম শাফেয়ি (রহ.)-এর মা দারিদ্র্যের মধ্যেও তাঁকে ইলমের পথে অবিচল রেখেছিলেন। আবার ইমাম বুখারি (রহ.)-এর মায়ের দোয়ার বরকতেই তাঁর দৃষ্টিশক্তি ফিরে আসে। এগুলো কোনো রূপক কাহিনি নয়; বরং প্রামাণ্য ঐতিহাসিক ঘটনা।
বর্তমান সময়ের মা কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। ডিজিটাল আসক্তি, নৈতিক অবক্ষয় ও সময়ের সংকট—সবকিছুর মাঝেই তাঁকে সন্তান গড়তে হচ্ছে। তবু ইসলাম তাঁকে একা ফেলে দেয়নি। বরং প্রতিটি ধৈর্য, প্রতিটি নীরব ত্যাগকে ইবাদতের মর্যাদা দিয়েছে।
একবার এক ব্যক্তির কঠোর পরিশ্রম দেখে সাহাবিরা বলেছিলেন, ‘হায়! যদি এটা আল্লাহর পথে হতো!’ তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, যদি সে তার ছোট সন্তানদের জন্য পরিশ্রম করে, তবে সে আল্লাহর পথেই আছে। আর যদি সে তার বৃদ্ধ পিতা-মাতার জন্য পরিশ্রম করে, তবুও সে আল্লাহর পথেই আছে। (সিলসিলা সহিহা ২/৫৩৮)
একটি আদর্শ সমাজ গড়তে হলে মায়ের দোয়া ও আদর্শকে অদৃশ্য ও তুচ্ছ ভাবার সুযোগ নেই। রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবার—সব স্তরেই মাকে সম্মান, সময় ও মানসিক নিরাপত্তা দিতে হবে। কারণ একজন আলোকিত মা মানেই একটি আলোকিত প্রজন্ম।
মা হয়তো আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকেন না, ইতিহাসের শিরোনামেও আসেন না। কিন্তু তাঁর সিজদার ভেতরেই লুকিয়ে থাকে একটি জাতির ভবিষ্যৎ। সন্তান মানুষ হবে নাকি পথ হারাবে—তার বড় অংশ নির্ধারিত হয় সেই নীরব দোয়াগুলোতে, যা মানুষ শোনে না; শুধু আল্লাহ শোনেন।

