কিছু কণ্ঠ সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নেয়। গান শেষ হলেও সেই কণ্ঠের আবেশ থেকে যায় শ্রোতাদের স্মৃতিতে। বাংলা চলচ্চিত্রের গানে তেমনই এক অনন্য নাম এন্ড্রু কিশোর।
কয়েক হাজার গানে কণ্ঠ দিয়ে জয় করেছেন অসংখ্য শ্রোতার মন। বাংলা সিনেমার গানে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ পেয়েছেন ‘প্লেব্যাক সম্রাট’ উপাধি। কালজয়ী এই সংগীতশিল্পীর জন্মদিন আজ।
দীর্ঘ ১০ মাস ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করে ২০২০ সালের ৬ জুলাই না ফেরার দেশে পাড়ি জমান এন্ড্রু কিশোর। জীবদ্দশায় জন্মদিন উদযাপন নিয়ে তার তেমন বাড়তি আগ্রহ ছিল না।
পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ঘরোয়াভাবেই দিনটি কাটাতেন। মৃত্যুর পর থেকে জন্মদিনে পরিবারের সদস্যরা তাকে বিশেষভাবে স্মরণ করেন। এ উপলক্ষে রাজশাহীতে তার সমাধিস্থলে গিয়ে প্রার্থনা করেন স্বজনেরা।
রাজশাহীতে জন্ম নেওয়া এন্ড্রু কিশোরের শৈশব ও বেড়ে ওঠা পদ্মাপাড়ের এই শহরেই। পড়াশোনা করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। তার বাবা ক্ষীতিশ চন্দ্র বাড়ৈ এবং মা মিনু বাড়ৈ রাজশাহী মহানগরীর বুলনপুর মিশন গার্লস হাই স্কুলের শিক্ষক ছিলেন।
মায়ের কাছেই তার পড়াশোনার হাতেখড়ি। সংগীতের প্রতি বিশেষ অনুরাগ ছিল মায়ের। তার প্রিয় শিল্পী ছিলেন ভারতের কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী কিশোর কুমার। প্রিয় শিল্পীর নামের সঙ্গে মিল রেখেই ছেলের নাম রাখেন কিশোর। মায়ের সংগীতপ্রীতি ও স্বপ্নপূরণের পথ ধরেই সংগীতাঙ্গনে পা রাখেন এন্ড্রু কিশোর।
আব্দুল আজিজ বাচ্চুর অধীনে প্রাথমিকভাবে সংগীতের তালিম নেওয়া শুরু করেন তিনি। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের পর নজরুলসংগীত, রবীন্দ্রসংগীত, আধুনিক, লোকসংগীত ও দেশাত্মবোধক গানের শিল্পী হিসেবে রাজশাহী বেতারে তালিকাভুক্ত হন।
১৯৭৭ সালে আলম খানের সুরে ‘মেইল ট্রেন’ চলচ্চিত্রের ‘অচিনপুরের রাজকুমারী নেই যে তার কেউ’ গানটির মধ্য দিয়ে চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক শুরু করেন এন্ড্রু কিশোর। তার রেকর্ড করা দ্বিতীয় গান ছিল বাদল রহমান পরিচালিত ‘এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী’ চলচ্চিত্রের ‘ধুম ধাড়াক্কা’।
তবে এ জে মিন্টু পরিচালিত ১৯৭৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘প্রতিজ্ঞা’ চলচ্চিত্রের ‘এক চোর যায় চলে’ গানটি গেয়ে শ্রোতাদের কাছে বিশেষ পরিচিতি পান তিনি। এরপর একের পর এক জনপ্রিয় গান উপহার দিয়ে সমৃদ্ধ করেন বাংলা চলচ্চিত্রের সংগীতভান্ডার।
১৯৮২ সালে মহিউদ্দিন পরিচালিত ‘বড় ভালো লোক ছিল’ চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক করে প্রথমবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান এন্ড্রু কিশোর। সৈয়দ শামসুল হকের লেখা ‘হায়রে মানুষ রঙিন ফানুস’ গানটির জন্য শ্রেষ্ঠ পুরুষ কণ্ঠশিল্পী বিভাগে এ পুরস্কার অর্জন করেন তিনি।
এরপর ১৯৮৪ সালে আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের কথা ও সুরে ‘নয়নের আলো’ চলচ্চিত্রে তিনটি গানে কণ্ঠ দেন এই শিল্পী। গানগুলো হলো ‘আমার সারা দেহ খেয়ো গো মাটি’, ‘আমার বাবার মুখে প্রথম যেদিন’ এবং ‘আমার বুকের মধ্যে খানে’। গানগুলো এখনো শ্রোতাদের কাছে জনপ্রিয়।
কয়েক দশকের সংগীতজীবনে অসংখ্য জনপ্রিয় গান উপহার দিয়েছেন এন্ড্রু কিশোর। কণ্ঠের স্বতন্ত্রতা, আবেগের প্রকাশ ও গায়কির বৈচিত্র্যে বাংলা চলচ্চিত্রের গানে হয়ে উঠেছিলেন পরিচিত এক নাম। সংগীতে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ আটবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন তিনি।
তার গাওয়া কালজয়ী গানগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘আমার সারা দেহ খেয়ো গো মাটি’, ‘হায়রে মানুষ রঙিন ফানুস, দম ফুরাইলে ঠুস’, ‘ডাক দিয়াছেন দয়াল আমারে’, ‘কারে দেখাব মনের দুঃখ গো’, ‘আমি চিরকাল প্রেমের কাঙাল’ এবং ‘এক জনমের ভালোবেসে ভরবে না মন’।
এ ছাড়া ‘পৃথিবীর যত সুখ আমি তোমার ছোঁয়াতে খুঁজে পেয়েছি’, ‘সবাই তো ভালোবাসা চায়’, ‘বেদের মেয়ে জোসনা আমায় কথা দিয়েছে’, ‘তুমি আমার জীবন আমি তোমার জীবন’, ‘ভালো আছি ভালো থেকো’, ‘তুমি মোর জীবনের ভাবনা’ ও ‘চোখ যে মনের কথা বলে’সহ অসংখ্য গান শ্রোতাদের মনে জায়গা করে নিয়েছে।
সময়ের সঙ্গে অনেক শিল্পী এসেছেন, জনপ্রিয়তাও পেয়েছেন। তবে এন্ড্রু কিশোরের গাওয়া গান এখনো শ্রোতাদের কাছে সমাদৃত। নতুন প্রজন্মের কাছেও তার গান জনপ্রিয়। শারীরিকভাবে অনুপস্থিত থাকলেও গানের মধ্য দিয়ে শ্রোতাদের স্মৃতিতে বেঁচে আছেন এই শিল্পী।

