চ্যানেল আইয়ের শোকবইয়ে লিখতে গিয়ে শোক প্রকাশ করতে পারেননি সংগীতশিল্পী কনকচাঁপা। শোকের বদলে তার মনে জেগেছিল গর্ব। কারণ, আইয়ুব বাচ্চুর গান মানুষের হৃদয়ে যে জায়গা করে নিয়েছে, সেটিকে একজন শিল্পীর সবচেয়ে বড় সাফল্য বলে মনে করেন তিনি। রকসংগীতে কোমল সুরের মেলবন্ধন ঘটিয়ে কীভাবে গানকে কবিতায় রূপ দিয়েছেন আইয়ুব বাচ্চু, সেই বিস্ময়ের কথাও জানিয়েছেন এই সংগীতশিল্পী।
বাংলা ব্যান্ডসংগীতের কিংবদন্তি আইয়ুব বাচ্চুর অষ্টম মৃত্যুবার্ষিকীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে এসব কথা লিখেছেন কনকচাঁপা। গায়ক ও গিটারবাদক আইয়ুব বাচ্চুকে উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠ গিটারবাদকদের একজন উল্লেখ করে তিনি লিখেছেন, এমন শিল্পীর জন্য শোকের চেয়ে গর্বই বেশি অনুভব করেন তিনি।
কনকচাঁপা লিখেছেন, ‘চ্যানেল আইয়ের শোকবইয়ে লিখতে গিয়ে আমি শোক লিখতেই পারছিলাম না। শোকের বদলে উঠে এল গর্ব! এই সুরের এবং গিটারের জাদুকর যা সৃষ্টি করেছেন, তার একটি গানও মাটিতে পড়েনি, সোজা চলে গিয়েছে মানুষের হৃদয়ের ভেতর। সে সব গান এদেশের যুবসমাজ নামতার মতো মুখস্থ গাইতে পারেন। তার গান খাতায় লিখতে হয় না! এর চেয়ে বড় সফলতা আর আছে একজন শিল্পীর?’
আইয়ুব বাচ্চুর গানের সুর ও মেলোডির বিশেষত্ব তুলে ধরে কনকচাঁপা আরও লিখেছেন, রক গানের মধ্যে কীভাবে তিনি রেশমের মতো কোমল মেলোডি যুক্ত করতেন, তা তার কাছে বিস্ময়কর মনে হয়। তার ভাষায়, আইয়ুব বাচ্চুর গান শেষ পর্যন্ত কবিতায় রূপ নিত। কঠিন এই কাজ যিনি সহজে করতে পারতেন, তাকে শুধু শিল্পী নয়, সাধক বলেই মনে করেন কনকচাঁপা।
তিনি লিখেছেন, ‘আর সাধকদের জন্য বুকের ভেতরে শোক আসে না, আসে গর্ব। আমাদের আইয়ুব বাচ্চু এই উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠ গিটারবাদক, আইয়ুব বাচ্চু আমাদের, গর্ব তো করবই।’
পোস্টের শেষাংশে প্রিয় এই শিল্পীর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে কনকচাঁপা লিখেছেন, ‘বাচ্চু ভাইয়ের অষ্টম মৃত্যুবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধা। হে “পাথরে ফুল ফোটানোর মালি”, ওপারে আল্লাহ আপনাকে শান্তিতে রাখুক।’
রুপালি গিটার হাতে যে শিল্পী বদলে দিয়েছিলেন বাংলা রকসংগীত
২০১৮ সালের ১৮ অক্টোবর না ফেরার দেশে পাড়ি জমান আইয়ুব বাচ্চু। সেই হিসাবে আজ ১৮ অক্টোবর তার অষ্টম মৃত্যুবার্ষিকী। আট বছর পেরিয়ে গেলেও তার গান, সুর ও গিটারের আবেদন কমেনি। বরং পুরোনো শ্রোতাদের পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের কাছেও তার সংগীত পৌঁছে যাচ্ছে।
চট্টগ্রামে জন্ম নেওয়া আইয়ুব বাচ্চু ছোটবেলা থেকেই সংগীতের প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন। কিশোর বয়সে বন্ধুদের সঙ্গে ব্যান্ড গঠনের মধ্য দিয়ে তার সংগীতযাত্রা শুরু হয়। পরে ‘ফিলিংস’ ও ‘সোলস’ ব্যান্ডের সঙ্গে যুক্ত হন তিনি। ১৯৯১ সালে গড়ে তোলেন নিজের ব্যান্ড ‘লাভ রান্স ব্লাইন্ড’, যা এলআরবি নামে শ্রোতাদের কাছে ব্যাপক পরিচিতি পায়। এই ব্যান্ডের মাধ্যমে বাংলা রকসংগীতে নিজের স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেন তিনি।
গায়ক হিসেবে জনপ্রিয়তার পাশাপাশি গিটারবাদক হিসেবেও আইয়ুব বাচ্চু হয়ে ওঠেন অনন্য। মঞ্চে তার গিটার বাজানোর ধরন, দীর্ঘ গিটার সোলো এবং শক্তিশালী পরিবেশনা বাংলা ব্যান্ডসংগীতকে দিয়েছে আলাদা মাত্রা। রক ও ব্লুজের সঙ্গে আবেগঘন সুরের মেলবন্ধন তার গানকে করেছে স্বতন্ত্র।
দীর্ঘ সংগীতজীবনে তিনি উপহার দিয়েছেন বহু জনপ্রিয় গান। ‘সেই তুমি’, ‘চলো বদলে যাই’, ‘কষ্ট পেতে ভালোবাসি’, ‘এখন অনেক রাত’, ‘হাসতে দেখো গাইতে দেখো’ ও ‘রুপালি গিটার’ এখনো শ্রোতাদের প্রিয় গানের তালিকায় রয়েছে। একক অ্যালবামের পাশাপাশি এলআরবির অ্যালবামগুলোও বাংলা ব্যান্ডসংগীতের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা করে নিয়েছে।
প্রেম, বিরহ, একাকিত্ব ও জীবনের নানা অনুভূতি তার গানে উঠে এসেছে গভীর আবেগে। কণ্ঠের পাশাপাশি গিটারের সুরেও শ্রোতাদের মুগ্ধ করেছেন তিনি। তার সৃষ্টির শক্তি এমনই যে, শারীরিকভাবে অনুপস্থিত থেকেও সংগীতপ্রেমীদের স্মৃতি ও ভালোবাসায় বেঁচে আছেন এই শিল্পী।
আইয়ুব বাচ্চুর মৃত্যুর পর চ্যানেল আইয়ের শোকবইয়ে তাকে নিয়ে নিজের অনুভূতি লিখেছিলেন কনকচাঁপা। আট বছর পর সেই স্মৃতি সামনে এনে আবারও জানালেন, একজন শিল্পীর প্রকৃত সাফল্য তার সৃষ্টির স্থায়িত্বে। যে গান মানুষের মুখে মুখে ফেরে, হৃদয়ে জায়গা করে নেয়, সেই গানই শিল্পীকে বাঁচিয়ে রাখে প্রজন্মের পর প্রজন্ম।
কনকচাঁপার কথায়, আইয়ুব বাচ্চুর জন্য শোক নয়, গর্বই বড় হয়ে ওঠে। আর সেই গর্বের সঙ্গে মিশে থাকে শ্রদ্ধা, ভালোবাসা এবং এক কিংবদন্তি শিল্পীর সৃষ্টির প্রতি চিরন্তন ঋণস্বীকার।

