নারায়ণগঞ্জে উৎসবমুখর পরিবেশ ও কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে পালিত হচ্ছে শারদীয় দুর্গোৎসব। ঢাকের বাদ্য, শঙ্খধ্বনি, আরতি ও অঞ্জলির মধ্য দিয়ে মুখর হয়ে উঠেছে জেলার বিভিন্ন পূজামণ্ডপ। প্রতিমা দর্শনে ভিড় করছেন নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোরসহ নানা বয়সী মানুষ। উৎসবের আনন্দের পাশাপাশি সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তৎপর রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্থানীয় প্রশাসন।
নারায়ণগঞ্জ সদর, সিদ্ধিরগঞ্জ, ফতুল্লা, বন্দর, সোনারগাঁ, রূপগঞ্জ ও আড়াইহাজারসহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় দুর্গাপূজাকে ঘিরে তৈরি হয়েছে প্রাণচাঞ্চল্য। মণ্ডপে মণ্ডপে চলছে ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা, প্রতিমা দর্শন ও সাংস্কৃতিক আয়োজন। পরিবার-পরিজন নিয়ে উৎসবে অংশ নিচ্ছেন দর্শনার্থীরা। ধর্মীয় উৎসবকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের উপস্থিতিতে মণ্ডপগুলোতে বিরাজ করছে আনন্দঘন পরিবেশ।
চলতি বছর নারায়ণগঞ্জ জেলার পাঁচটি উপজেলায় ২৪০টি পূজামণ্ডপ ও মন্দিরে দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়েছে। নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছেন ৯৪৭ জন পুলিশ সদস্য ও ১ হাজার ৫১৮ জন আনসার সদস্য। পাশাপাশি এসআরবি, বিজিবি, কোস্ট গার্ড ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরাও নিরাপত্তা কার্যক্রমে দায়িত্ব পালন করছেন।
পূজামণ্ডপের গুরুত্ব ও ঝুঁকি বিবেচনায় নিরাপত্তাব্যবস্থা সাজানো হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ মণ্ডপে বাড়তি নজরদারি, টহল, সিসিটিভি পর্যবেক্ষণ এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি রাখা হয়েছে। উৎসব চলাকালে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
নিরাপত্তার অংশ হিসেবে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত মণ্ডপগুলোতে বিশেষ নজরদারি রাখা হচ্ছে। মণ্ডপের প্রবেশপথ, আশপাশের সড়ক ও দর্শনার্থীদের চলাচলের ওপর নজর দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি গুজব, অপপ্রচার ও সাম্প্রদায়িক উসকানি প্রতিরোধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও নজরদারি চালানো হচ্ছে।
মণ্ডপ কমিটির স্বেচ্ছাসেবকদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে দায়িত্ব পালনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সন্দেহজনক কোনো ব্যক্তি বা বস্তু চোখে পড়লে কিংবা কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হলে দ্রুত পুলিশকে জানানোর নির্দেশনাও রয়েছে।
দুর্গোৎসব নির্বিঘ্ন রাখতে জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। পূজামণ্ডপের নিরাপত্তা, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা, প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ এবং দর্শনার্থীদের চলাচল স্বাভাবিক রাখার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এ ছাড়া ভিড়ের কারণে যানজট সৃষ্টি হলে তা নিয়ন্ত্রণ, জরুরি সেবার গাড়ি চলাচল নির্বিঘ্ন রাখা এবং কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। উৎসবের সার্বিক পরিবেশ স্বাভাবিক রাখতে প্রশাসন, পুলিশ, পূজা উদযাপন কমিটি ও স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকদের মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন।
দুর্গাপূজা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব হলেও এটি বাংলার সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন মণ্ডপে দর্শনার্থীদের উপস্থিতি এবং উৎসব ঘিরে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ সেই সম্প্রীতিরই প্রতিফলন।
উৎসবের আনন্দ সবার মধ্যে ছড়িয়ে দিতে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের অংশগ্রহণ ও পারস্পরিক সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। শান্তিপূর্ণ পরিবেশে পূজা উদযাপনের মধ্য দিয়ে সামাজিক বন্ধন আরও দৃঢ় হবে—এমন প্রত্যাশা স্থানীয়দের।
তবে উৎসবের ভিড়ে শিশুদের প্রতি বাড়তি নজর রাখা, ব্যক্তিগত মালামাল নিরাপদে রাখা, যান চলাচলে শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নির্দেশনা মেনে চলাও জরুরি।
সব মিলিয়ে, নারায়ণগঞ্জে দুর্গোৎসব ঘিরে একদিকে বিরাজ করছে উৎসবের আমেজ, অন্যদিকে রয়েছে কঠোর নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক নজরদারি। সংশ্লিষ্ট সবার সমন্বিত উদ্যোগে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য, আনন্দ ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মধ্য দিয়ে দুর্গোৎসব উদযাপিত হবে—এমন প্রত্যাশা সবার।

