নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক মাঠে আবারও নিজেদের উপস্থিতির জানান দিতে শুরু করেছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের কিছু নেতাকর্মী। গত কয়েক দিনে শহর ও জেলার বিভিন্ন এলাকায় একাধিক ঝটিকা মিছিলের ঘটনা ঘটেছে। কখনো ভোরে, কখনো সকালে কিংবা গুরুত্বপূর্ণ সড়কে হঠাৎ করেই মিছিল বের করে দ্রুত সরে যাচ্ছেন অংশগ্রহণকারীরা।
তবে এসব কর্মসূচির ধরন বিশ্লেষণ করলে এখন পর্যন্ত বড় কোনো ধারাবাহিক আন্দোলনের চিত্র স্পষ্ট নয়। বরং বিচ্ছিন্ন ঝটিকা মিছিল, মিছিলের প্রস্তুতি এবং পুলিশের সঙ্গে লুকোচুরি তৎপরতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে তাদের প্রকাশ্য কর্মকাণ্ড।
গত ১৪ সেপ্টেম্বর ভোরে নারায়ণগঞ্জ শহরের বঙ্গবন্ধু সড়কে মহানগর যুবলীগের ব্যানারে ঝটিকা মিছিল হয়। বলাকা ফিলিং স্টেশনের সামনে থেকে শুরু হয়ে মিছিলটি কালিরবাজার ব্যাংকের মোড়ের দিকে যায় বলে স্থানীয় সূত্র ও পুলিশ জানিয়েছে। অংশগ্রহণকারীদের কয়েকজনকে মাস্ক ও ক্যাপ পরা অবস্থায় দেখা যায়।
এর কয়েক দিন পর ১৮ সেপ্টেম্বর শহরের মাসদাইর এলাকায় যুবলীগের ব্যানারে আরও একটি ঝটিকা মিছিলের খবর আসে। স্থানীয় সূত্রের বরাতে জানাযায় অর্ধশতাধিক নেতাকর্মীর অংশ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
সবশেষ বন্দর উপজেলার লাঙ্গলবন্দ এলাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে আওয়ামী লীগের ব্যানারে ঝটিকা মিছিলের ঘটনায় ১১ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাস্থল থেকে লাঠিসোঁটা উদ্ধার করা হয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে।
একই সময়ে রূপগঞ্জের পূর্বাচল ৩০০ ফিট এলাকায়ও যুবলীগের ব্যানারে মিছিলের খবর পাওয়া গেছে। অর্থাৎ বিচ্ছিন্নভাবে হলেও জেলার একাধিক এলাকায় আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের কিছু নেতাকর্মীর প্রকাশ্য তৎপরতা দেখা যাচ্ছে।
সাম্প্রতিক কর্মসূচিগুলোর একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে দীর্ঘ সময় অবস্থান না করে দ্রুত মিছিল করা এবং পরে সরে যাওয়া। বড় জমায়েত, প্রকাশ্য সমাবেশ কিংবা ধারাবাহিক কর্মসূচির বদলে স্বল্প সময়ের এসব কর্মসূচিকেই আপাতত বেশি দেখা যাচ্ছে।
রাজনৈতিকভাবে এটি একদিকে মাঠে উপস্থিতির জানান দেওয়ার চেষ্টা হিসেবে দেখা যেতে পারে, অন্যদিকে সংগঠনের প্রকাশ্য কর্মকাণ্ড চালানোর ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতারও ইঙ্গিত দিতে পারে। তবে এসব কর্মসূচির উদ্দেশ্য সম্পর্কে আওয়ামী লীগের স্থানীয় কোনো প্রকাশ্য সাংগঠনিক বক্তব্য পাওয়া না গেলে এর পেছনের নির্দিষ্ট রাজনৈতিক কৌশল সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন।
নারায়ণগঞ্জে আওয়ামী লীগের পুরোনো সাংগঠনিক কাঠামোর অনেক পরিচিত নেতাকর্মী বর্তমানে প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে নেই। এর মধ্যে আত্মগোপনে থাকা, দেশের বাইরে অবস্থান কিংবা মামলা-গ্রেপ্তারের কারণে মাঠে অনুপস্থিত থাকার বিষয়গুলো স্থানীয় রাজনীতিতে আলোচিত।
আওয়ামী লীগের এসব কর্মসূচির বিপরীতে নারায়ণগঞ্জের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও সক্রিয় অবস্থানে রয়েছে। মিছিলের খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে কর্মসূচি ছত্রভঙ্গ করছে এবং বিভিন্ন ঘটনায় আটক ও গ্রেপ্তার করা হচ্ছে।
লাঙ্গলবন্দের ঘটনায় ১১ জন গ্রেপ্তারের পাশাপাশি রূপগঞ্জেও মিছিলের প্রস্তুতিকে কেন্দ্র করে আটকের খবর এসেছে। ফলে মাঠে প্রকাশ্যে কর্মসূচি নেওয়ার ক্ষেত্রে পুলিশের নজরদারি ও অভিযান আওয়ামী লীগের স্থানীয় কর্মীদের জন্য একটি বড় বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সাম্প্রতিক ধারাবাহিক ঝটিকা মিছিল স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি করছে এগুলো কি বিচ্ছিন্ন কর্মসূচি, নাকি ভবিষ্যতে বড় ধরনের আন্দোলনের প্রস্তুতির অংশ?
এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে আসা ঘটনাগুলোতে বড় ধরনের সাংগঠনিক সমাবেশ, দীর্ঘস্থায়ী অবস্থান কর্মসূচি কিংবা জেলার বিভিন্ন ইউনিটকে একযোগে মাঠে নামানোর মতো কর্মসূচি দেখা যায়নি। তাই বর্তমান তৎপরতাকে সরাসরি বড় আন্দোলনের সূচনা হিসেবে চিহ্নিত করার মতো পর্যাপ্ত প্রকাশ্য তথ্য নেই।
তবে একের পর এক এলাকায় একই ধরনের কর্মসূচি হওয়ায় বিষয়টি পুরোপুরি উপেক্ষা করার সুযোগও নেই। বিশেষ করে শহর, বন্দর ও রূপগঞ্জে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো দেখাচ্ছে কিছু নেতাকর্মী প্রকাশ্যে রাজনৈতিক উপস্থিতি জানান দেওয়ার চেষ্টা করছেন।
নারায়ণগঞ্জে আওয়ামী লীগের সাম্প্রতিক তৎপরতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক সম্ভবত এখানেই। একদিকে ধারাবাহিকভাবে ঝটিকা মিছিল হচ্ছে, অন্যদিকে এসব কর্মসূচি দ্রুত ছত্রভঙ্গ হয়ে যাচ্ছে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে গ্রেপ্তারের ঘটনাও ঘটছে।
ফলে বর্তমান পরিস্থিতিকে দুটি দিক থেকে দেখা যায় একটি হলো, আওয়ামী লীগের কিছু নেতাকর্মী এখনো সংগঠিত হয়ে মাঠে উপস্থিতি জানান দেওয়ার চেষ্টা করছেন; অন্যটি হলো, তাদের প্রকাশ্য কর্মসূচি এখনো সীমিত পরিসর অতিক্রম করতে পারেনি।
নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক মাঠে তাই এখন মূল প্রশাসন ঝটিকা মিছিলগুলো কি ধীরে ধীরে বড় ও সমন্বিত কর্মসূচিতে রূপ নেবে, নাকি বিচ্ছিন্ন কিছু তৎপরতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে? সামনের দিনগুলোর কর্মসূচিই এর উত্তর দেবে।

