নারায়ণগঞ্জ আদালত প্রাঙ্গণে জেলা ও দায়রা জজ আদালত এবং চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের অবস্থান নিয়ে নতুন করে তৈরি হওয়া জটিলতা ক্রমেই রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক রূপ নিচ্ছে। আদালত পৃথকীকরণ কিংবা কিছু আদালতের কার্যক্রম কালীরবাজার এলাকার নতুন ভবনে স্থানান্তরের আলোচনা ঘিরে নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির একাংশ আন্দোলনে নেমেছে। তবে এই আন্দোলনে সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট এইচ এম আনোয়ার প্রধানকে সামনের সারিতে দেখা গেলেও বিএনপিপন্থী আইনজীবী রাজনীতির কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা সরাসরি মাঠে না থাকায় তিনি কার্যত একা হয়ে পড়েছেন—এমন আলোচনা এখন নারায়ণগঞ্জ বারের অঙ্গনে জোরালো হয়েছে।
গত ২০ আগস্ট ‘নারায়ণগঞ্জ আইনজীবী অধিকার রক্ষা পরিষদ’ জেলা ও দায়রা জজ আদালত এবং চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত পৃথক স্থানে পরিচালনার প্রস্তাবের বিরোধিতা করে। একই সঙ্গে আদালতগুলো বিচ্ছিন্ন না করে বিদ্যমান অবকাঠামোর সর্বোচ্চ ব্যবহার করার পক্ষে বিকল্প প্রস্তাব সামনে আসে। এরপর ২১ আগস্ট নতুন করে চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত কালীরবাজারের নতুন ভবনে স্থানান্তরের আলোচনা সামনে আসে এবং আইনজীবীদের একটি অংশ আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেয়।
এরই ধারাবাহিকতায় ২৪ আগস্ট জরুরি সংবাদ সম্মেলনে অবস্থান স্পষ্ট করেন জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট এইচ এম আনোয়ার প্রধান। তিনি জানান, আদালত স্থানান্তর নিয়ে বিভিন্ন মাধ্যমে আলোচনা চললেও তখন পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে জেলা আইনজীবী সমিতির কাছে কোনো আদেশ, নির্দেশনা বা প্রজ্ঞাপন পৌঁছেনি। তাঁর দাবি, বর্তমান আদালত ভবনেই প্রয়োজনীয় জায়গা রয়েছে এবং সেখানেই বিভিন্ন আদালতের কার্যক্রম পরিচালনার ব্যবস্থা করা সম্ভব। একই সঙ্গে তিনি আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীদের বিভ্রান্ত না হওয়ার আহ্বান জানান।
আনোয়ার প্রধানের এই অবস্থানের পর ২৫ আগস্ট জেলা আইনজীবী সমিতির বিশেষ সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভাপতি অ্যাডভোকেট সরকার হুমায়ুন কবিরের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার প্রধানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত ওই সভায় সিনিয়র-জুনিয়র প্রায় সব পর্যায়ের আইনজীবী উপস্থিত ছিলেন বলে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
তবে আন্দোলনের মাঠের চিত্রে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন সমীকরণ। আদালত হস্তান্তর বা পৃথকীকরণের বিরোধিতায় আনোয়ার প্রধান ধারাবাহিকভাবে সক্রিয় থাকলেও জেলা ও মহানগর বিএনপির আইনজীবী রাজনীতির কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা সরাসরি তাঁর সঙ্গে কর্মসূচিতে নেই। এ তালিকায় জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি ও বর্তমানে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান, বর্তমান সভাপতি অ্যাডভোকেট সরকার হুমায়ুন কবির এবং মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট আবু আল ইউসুফ খান টিপুর মতো নেতাদের নাম আলোচনায় আসছে।
এখানেই নারায়ণগঞ্জ বারের সাম্প্রতিক রাজনীতির পুরোনো সমীকরণ নতুন করে সামনে এসেছে। সরকার হুমায়ুন কবির ও এইচ এম আনোয়ার প্রধানের নেতৃত্বাধীন জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম-সমর্থিত প্যানেল ২০২৫-২৬ সালের নির্বাচনে ১৭টি পদের মধ্যে ১৬টিতে জয় পেয়েছিল। অর্থাৎ নির্বাচনের সময় দুজনের নেতৃত্বে বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের মধ্যে শক্তিশালী ঐক্যের চিত্র দেখা গেলেও দায়িত্ব পালনের পর্যায়ে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের মধ্যে কাজের ধরন নিয়ে দূরত্ব তৈরি হয়েছে বলে বারের অভ্যন্তরে আলোচনা রয়েছে।
এর আগে ২০২৪-২৫ মেয়াদেও সরকার হুমায়ুন কবির ও এইচ এম আনোয়ার প্রধানের নেতৃত্বাধীন কমিটি দায়িত্ব গ্রহণ করেছিল। ওই সময়ও সাবেক সভাপতি ও মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খানসহ বিএনপিপন্থী আইনজীবী নেতারা কমিটির সঙ্গে সাংগঠনিকভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন।
নারায়ণগঞ্জ বারের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবীর রাজনৈতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আদালতের অবস্থান পরিবর্তনের মতো স্পর্শকাতর প্রশাসনিক ইস্যুতে সরাসরি আন্দোলনে যাওয়ার আগে প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের সুযোগ রাখা উচিত—এমন একটি অবস্থান বিএনপির প্রবীণ আইনজীবী নেতাদের মধ্যে থাকতে পারে।
বিশেষ করে অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান বর্তমানে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকায় তাঁর জন্য প্রশাসনের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতমুখী অবস্থানে যাওয়া রাজনৈতিকভাবে ভিন্ন মাত্রা তৈরি করতে পারে। একইভাবে বিএনপির সাংগঠনিক পর্যায়ে দায়িত্বশীল আইনজীবী নেতাদের কাছেও আদালত-সংক্রান্ত ইস্যুতে দলীয় ঐকমত্য ছাড়া আন্দোলনে যুক্ত হওয়ার প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে—এমনটাই মনে করছেন বারের একাধিক আইনজীবী।
তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট শীর্ষ নেতাদের পক্ষ থেকে আনোয়ার প্রধানকে আন্দোলনে একা করে দেওয়ার কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে বিষয়টি আপাতত বার ও বিএনপিপন্থী আইনজীবী মহলের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
আনোয়ার প্রধানের অবস্থান শুরু থেকেই তুলনামূলকভাবে কঠোর। তাঁর বক্তব্যের মূল জায়গা—আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীদের স্বার্থে আদালতগুলোকে একই প্রাঙ্গণে রাখা এবং হঠকারী সিদ্ধান্তের মাধ্যমে কোনো আদালত স্থানান্তর না করা। ২৪ আগস্টের সংবাদ সম্মেলনেও তিনি বর্তমান ভবনের মধ্যেই প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ব্যবস্থাপনার কথা তুলে ধরেন।
অন্যদিকে, শীর্ষ বিএনপি আইনজীবী নেতাদের মাঠে অনুপস্থিতি আন্দোলনের রাজনৈতিক শক্তি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। কারণ নারায়ণগঞ্জ বারের সাম্প্রতিক ইতিহাসে আদালতকেন্দ্রিক আন্দোলন শুধু আইনজীবী সমিতির প্রশাসনিক বিষয় নয়; এর সঙ্গে জেলা ও মহানগর বিএনপির আইনজীবী রাজনীতির প্রভাবও জড়িত।
ফলে আনোয়ার প্রধানের সামনে এখন দুটি চ্যালেঞ্জ—একদিকে সাধারণ আইনজীবীদের ঐক্য ধরে রেখে আদালত হস্তান্তর বা পৃথকীকরণের বিরোধিতা করা, অন্যদিকে বিএনপিপন্থী আইনজীবী নেতৃত্বের বড় অংশকে একই অবস্থানে আনা।
সাম্প্রতিক সংবাদ সম্মেলনে আনোয়ার প্রধান নিজেই জানিয়েছেন, তখন পর্যন্ত আইনজীবী সমিতি সরকারের কোনো আনুষ্ঠানিক আদেশ বা প্রজ্ঞাপন পায়নি। ফলে আদালত স্থানান্তরের বিষয়টি এখনো মূলত আলোচনা, প্রস্তাব ও প্রশাসনিক তৎপরতার পর্যায়েই রয়েছে—এমন চিত্র পাওয়া যাচ্ছে।
তবে ২০ আগস্টের পর থেকে ধারাবাহিকভাবে বিষয়টি নিয়ে আইনজীবীদের প্রতিবাদ, সংবাদ সম্মেলন, সাধারণ সভা ও আন্দোলনের হুঁশিয়ারি পরিস্থিতিকে উত্তপ্ত করেছে। একই সময়ে ২৭ আগস্ট আদালতপাড়ায় নতুন সরকারি আইনজীবী নিয়োগ নিয়ে আরেক দফা আইনজীবীদের বিক্ষোভ মিছিল হয়েছে। যদিও এই কর্মসূচিটি সরাসরি আদালত স্থানান্তর ইস্যুতে নয়, তবু সামগ্রিকভাবে নারায়ণগঞ্জ আদালত অঙ্গনে প্রশাসনিক ও সাংগঠনিক অসন্তোষের বহুমাত্রিক চিত্র সামনে এসেছে।
সব মিলিয়ে আদালত হস্তান্তর বা পৃথকীকরণ নিয়ে সিদ্ধান্ত এখনো চূড়ান্ত পর্যায়ে না গেলেও এ ইস্যুতে নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির ভেতরের রাজনৈতিক সমীকরণ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। আন্দোলনের অন্যতম মুখ আনোয়ার প্রধান একদিকে সাধারণ আইনজীবীদের সমর্থন ধরে রাখার চেষ্টা করছেন, অন্যদিকে তাঁর সঙ্গে একই রাজনৈতিক বলয়ের প্রভাবশালী নেতাদের দৃশ্যমান দূরত্ব নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
এখন দেখার বিষয়, আদালত হস্তান্তর নিয়ে শেষ পর্যন্ত প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত কী হয় এবং সেই সিদ্ধান্তের আগে বিএনপিপন্থী আইনজীবী নেতারা আনোয়ার প্রধানের আন্দোলনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হন, নাকি আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথেই থাকেন। কারণ আদালত এক রাখার দাবিতে আন্দোলন যতই দীর্ঘ হবে, ততই নারায়ণগঞ্জ বারের অভ্যন্তরীণ নেতৃত্বের এই রাজনৈতিক দূরত্বও প্রকাশ্য হয়ে উঠতে পারে।

