দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম ও দেড় দশকের রাজনৈতিক প্রতিকূলতা পেরিয়ে ক্ষমতায় এলেও নারায়ণগঞ্জ বিএনপির সাংগঠনিক ঐক্য এখনো দৃশ্যমানভাবে সুসংহত হয়নি। বরং জেলা ও মহানগর পর্যায়ে বিভিন্ন বলয়, নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা, বহিষ্কৃত নেতাদের নিষ্ক্রিয়তা এবং সহযোগী সংগঠনগুলোর পূর্ণাঙ্গ কমিটি না থাকায় দলীয় কার্যক্রমে এক ধরনের স্থবিরতা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, ব্যক্তি-কেন্দ্রিক রাজনীতি ও তোষামুদির সংস্কৃতি তৃণমূলের মধ্যে দূরত্ব বাড়াচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে সংগঠনের জন্য অশনিসংকেত হতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ভাষ্য, যে কোনো গণতান্ত্রিক দলে মতপার্থক্য থাকতেই পারে। তবে মতপার্থক্য যদি সাংগঠনিক বিভক্তিতে রূপ নেয়, তাহলে তার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে তৃণমূলে। বর্তমানে নারায়ণগঞ্জ বিএনপির ক্ষেত্রেও এমন চিত্র দেখা যাচ্ছে। দলীয় ঐক্যের কথা নিয়মিত বলা হলেও বাস্তবে বিভিন্ন পর্যায়ে অনুসারীভিত্তিক বলয় এবং নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা সংগঠনের ভেতরে দূরত্ব সৃষ্টি করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, গত বছরের গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বড় পরিবর্তন এসেছে। দীর্ঘ সময়ের রাজনৈতিক অস্থিরতার পর নতুন পরিবেশে রাজনৈতিক দলগুলোর সামনে জনমুখী ও অংশগ্রহণমূলক রাজনীতির সুযোগ তৈরি হয়েছে। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে সাংগঠনিক ভিত্তি আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তা থাকলেও নারায়ণগঞ্জ বিএনপিতে সে ধরনের কার্যকর উদ্যোগ এখনো দৃশ্যমান নয়।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠনের পর নারায়ণগঞ্জের পাঁচটি আসনের মধ্যে চারটিতে দলের প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছেন। রূপগঞ্জে মোস্তাফিজুর রহমান দীপু ভূঁইয়া, আড়াইহাজারে নজরুল ইসলাম আজাদ, সোনারগাঁ–সিদ্ধিরগঞ্জে আজহারুল ইসলাম মান্নান এবং সদর–বন্দর আসনে অ্যাডভোকেট আবুল কালাম সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। জনপ্রতিনিধি হিসেবে তারা নিজ নিজ এলাকায় উন্নয়ন ও জনসম্পৃক্ত কার্যক্রমে ব্যস্ত থাকলেও সাংগঠনিক পুনর্গঠন ও তৃণমূলকে সক্রিয় করার বিষয়ে প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে দলীয় নেতাকর্মীদের একাংশের।
দলীয় সূত্র বলছে, নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ায় বহিষ্কৃত কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা এখনো মূলধারার রাজনীতিতে সক্রিয় হতে পারেননি। তাদের অনুসারীদের একটি অংশও কার্যত সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের বাইরে রয়েছে। জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য গিয়াসউদ্দিন এবং শিল্পপতি শাহ আলমসহ কয়েকজন প্রভাবশালী নেতার রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো সিদ্ধান্ত না আসায় তাদের অনুসারীদের মধ্যেও অনিশ্চয়তা রয়েছে।
এদিকে জেলা ও মহানগর বিএনপির বেশ কয়েকটি সহযোগী সংগঠনের পূর্ণাঙ্গ কমিটি দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকায় নতুন নেতৃত্ব তৈরির প্রক্রিয়াও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, ছাত্রদলসহ বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা নতুন কমিটির অপেক্ষায় থাকলেও এ বিষয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই বলে জানা গেছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, একটি রাজনৈতিক দলকে শক্তিশালী করতে শুধু নির্বাচনী সাফল্য যথেষ্ট নয়। নিয়মিত সাংগঠনিক কার্যক্রম, নতুন নেতৃত্বের বিকাশ, কর্মীদের মূল্যায়ন এবং মতপার্থক্য নিরসনের উদ্যোগই একটি দলকে দীর্ঘমেয়াদে টিকিয়ে রাখে। অন্যদিকে ব্যক্তি-নির্ভর বলয়, অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতা এবং যোগাযোগের ঘাটতি সংগঠনকে দুর্বল করে দেয়।
স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিমত, নারায়ণগঞ্জ বিএনপির সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সাংগঠনিক ঐক্য সুসংহত করা। বহিষ্কৃত বা নিষ্ক্রিয় নেতাকর্মীদের বিষয়ে দলীয় নীতিমালা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া, দীর্ঘদিনের শূন্য কমিটিগুলো পূরণ করা এবং তৃণমূলের সঙ্গে নেতৃত্বের যোগাযোগ বাড়ানো না গেলে ভবিষ্যতে সাংগঠনিক দুর্বলতা আরও প্রকট হতে পারে।
তাদের মতে, রাজনীতির মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া। ব্যক্তি কিংবা বলয়ের চেয়ে সংগঠনকে প্রাধান্য দেওয়া গেলে নারায়ণগঞ্জ বিএনপি আগামী দিনের রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আরও শক্ত অবস্থান গড়ে তুলতে পারবে।

