নারায়ণগঞ্জের সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী একসময় আওয়ামী লীগের অন্যতম সোচ্চার নেতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক সমাবেশে তিনি বিএনপি ও বিরোধীদের বিরুদ্ধে কঠোর বক্তব্য দিয়েছেন। কিন্তু প্রায় ১৩ মাস কারাভোগের পর মুক্তি পেয়ে বর্তমান সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করায় রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকের প্রশ্ন, হুঙ্কারের রাজনীতি থেকে কি এবার আপোষের রাজনীতিতে হাঁটছেন নারায়ণগঞ্জ মহানগর আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি আইভী?
সেলিনা হায়াৎ আইভী নারায়ণগঞ্জের প্রয়াত জনপ্রিয় পৌর চেয়ারম্যান আলী আহম্মদ চুনকার কন্যা। তিনি ২০০৩ সালে নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে দেশের প্রথম নারী পৌর চেয়ারম্যানদের একজন হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। এর পরে ২০১১ সালের ৩০ অক্টোবর প্রথমবার মেয়র নির্বাচিত হন। ২০১৬ সালের ২২ ডিসেম্বর দ্বিতীয়বার মেয়র নির্বাচিত হন এবং ২০২২ সালের ১৬ জানুয়ারি তৃতীয়বার মেয়র নির্বাচিত হন।
২০২৫ সালের ৯ মে ভোরে নারায়ণগঞ্জ শহরের দেওভোগের নিজ বাসা থেকে পুলিশ সেলিনা হায়াৎ আইভীকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারের সময় তিনি সমর্থকদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য দেন এবং “জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু” স্লোগান দিতে দিতে পুলিশের গাড়িতে ওঠেন। ঘটনাটি সে সময় দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়।
গ্রেপ্তারের পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় সংঘটিত বিভিন্ন ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। তার বিরুদ্ধে মোট ১২টি মামলা রয়েছে বলে আদালত ও কারা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ৩টি হত্যা মামলা ২টি হত্যাচেষ্টা মামলা বিস্ফোরক ও সহিংসতা সংক্রান্ত আরও কয়েকটি মামলা হয় তার বিরুদ্ধে। বিভিন্ন মামলায় জামিন পেলেও পরবর্তীতে নতুন মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছিল।
২০২৫ সালের ৯ মে গ্রেপ্তারের পর তাকে গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় মহিলা কারাগারে পাঠানো হয়। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর ২০২৬ সালের ৩ জুন রাতে তিনি কারামুক্ত হন। অর্থাৎ প্রায় ১৩ মাস কারাগারে ছিলেন তিনি।
সবগুলো মামলায় উচ্চ আদালতের জামিন বহাল থাকার পর ২০২৬ সালের ৩ জুন রাত ১০টার দিকে কাশিমপুর কেন্দ্রীয় মহিলা কারাগার থেকে মুক্তি পান সেলিনা হায়াৎ আইভী। পরে মধ্যরাতে তিনি নারায়ণগঞ্জের দেওভোগের বাসভবনে পৌঁছান।
কারামুক্ত হওয়ার পর আইভী সাংবাদিকদের বলেন, তিনি বিচার বিভাগের প্রতি কৃতজ্ঞ এবং বর্তমান সরকারের প্রতিও ধন্যবাদ জ্ঞাপন করছেন। তিনি একটি “মানবিক সরকার” গঠনের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন এবং কারাগারে থাকা নিরপরাধ নারীদের প্রতিও সরকারের সদয় হওয়ার আহ্বান জানান।
আইভীর এই বক্তব্যকে ঘিরে রাজনৈতিক মহলে নানা ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ শুরু হয়েছে। সমালোচকদের একাংশের দাবি, দীর্ঘ কারাবাসের পর সরকারের প্রতি প্রকাশ্যে কৃতজ্ঞতা জানানো তার রাজনৈতিক অবস্থানের পরিবর্তনের ইঙ্গিত হতে পারে। অন্যদিকে তার সমর্থকরা বলছেন, আদালতের মাধ্যমে জামিন পাওয়ার পর সরকারকে ধন্যবাদ জানানো একটি সৌজন্যমূলক বক্তব্য, এর সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক আপোষের সম্পর্ক নেই।
তবে বাস্তবতা হলো, একসময় রাজপথে কঠোর অবস্থানের জন্য পরিচিত আইভীর বর্তমান বক্তব্য নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে কি না, তা সময়ই বলে দেবে।

