আন্তর্জাতিক বাজারে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) দাম বেড়ে যাওয়ায় আমদানি ব্যয় মেটাতে বড় ধরনের আর্থিক চাপে পড়েছে বাংলাদেশ। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় তুলনামূলক বেশি দামে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কিনতে হচ্ছে। এতে কয়েকগুণ বাড়ছে সরকারের ভর্তুকি।
বাংলাদেশ তেল গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) হিসাব অনুযায়ী, নির্দিষ্ট সংখ্যক কার্গোর মূল্যবৃদ্ধির কারণে অতিরিক্ত ব্যয় দাঁড়াতে পারে প্রায় ৪১ হাজার ৩৪৮ কোটি টাকা।
এদিকে চলতি (২০২৬-২৭) অর্থবছরে এলএনজি আমদানিতে ভর্তুকির জন্য বাজেটে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৬ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত (আগামী মাস পর্যন্ত শিডিউল করা) এ খাতে ভর্তুকি বাবদ ব্যয় হয়েছে ২৫ হাজার কোটি টাকা।
আন্তর্জাতিক বাজারে উচ্চমূল্য অব্যাহত থাকলে ভর্তুকির প্রয়োজন আরও বাড়তে পারে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, এ পরিস্থিতি শুধু আমদানি ব্যয় বাড়াচ্ছে না, বরং সরকারের বাজেট ব্যবস্থাপনা, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ এবং নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করার সক্ষমতাকেও চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে।
চুক্তির গ্যাস না পেয়ে স্পট মার্কেট নির্ভরতা
বাংলাদেশের এলএনজি আমদানির বড় অংশ দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় আসে। এসব চুক্তিতে তুলনামূলক স্থিতিশীলভাবে দাম নির্ধারিত হয়। আর স্পট মার্কেটে আন্তর্জাতিক চাহিদা, সরবরাহ পরিস্থিতি ও ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাবে দাম দ্রুত ওঠা-নামা করে।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানকে কেন্দ্র করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার পর আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়ে। হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্য থেকে এলএনজি সরবরাহেও তৈরি হয় সংকট। কাতার এনার্জিসহ কয়েকটি সরবরাহকারীর দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় বাংলাদেশকে বিকল্প উৎস থেকে গ্যাস সংগ্রহ করতে হচ্ছে।
আগে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজি প্রায় ৯ থেকে ১১ ডলারে পাওয়া যেত। কিন্তু যুদ্ধের পর স্পট মার্কেটে দাম বেড়ে ২০ ডলারের ওপরে উঠে যায়। পরবর্তীসময়ে কিছু কার্গোর দাম ২৮ থেকে ৩০ ডলারের কাছাকাছিও পৌঁছেছে। ফলে একই পরিমাণ গ্যাস আমদানিতে আগের তুলনায় অনেক বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।
যেভাবে বাড়তি ব্যয় ৪১ হাজার কোটি টাকা
পেট্রোবাংলার নথিতে বলা হয়েছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের সঙ্গে তুলনা করলে চলতি বছরের মার্চ থেকে অক্টোবর পর্যন্ত স্পট মার্কেট থেকে কেনা কার্গোগুলোর মূল্য প্রতি এমএমবিটিইউ ১৫ ডলার বেড়ে প্রতি এমএমবিটিইউ ২৩ ডলার হয়েছে। এ কারণে শুধু স্পট মার্কেট থেকে কেনা কার্গোপ্রতি ব্যয় বেড়েছে ৩৩০ কোটি টাকা।
পেট্রোবাংলার নথিতে ২০২৬ সালের এলএনজি আমদানির সম্ভাব্য ব্যয় বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে তুলে ধরা হয়েছে দুটি আলাদা হিসাব।
প্রথমত, দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় এক বছরে ৮৬টি কার্গো আসার কথা। অক্টোবর পর্যন্ত এসেছে ২৬টি। একটি নভেম্বরে আসবে। ডিসেম্বরের আরেকটি কার্গো আসার সম্ভাবনা আছে। এতে সরবরাহ না পাওয়া ৫৮টি কার্গোর পরিবর্তে বিকল্প উৎস থেকে গ্যাস কেনার ক্ষেত্রে বাড়তি ব্যয়ের হিসাব করা হয়েছে।
নথিতে স্পট মার্কেটে প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজির গড় দাম ২৩ ডলার এবং দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির গড় দাম ৯ দশমিক ৭৫ ডলার ধরা হয়েছে। অর্থাৎ, প্রতি ইউনিটে দামের ব্যবধান ১৩ দশমিক ২৫ ডলার। এই ব্যবধানের ভিত্তিতে ৫৮টি কার্গোর জন্য অতিরিক্ত ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩১ হাজার ৭৬০ কোটি টাকা।
দ্বিতীয়ত, স্পট মার্কেট থেকে আগে কেনা কার্গোর তুলনায় নতুন করে কেনা ২৯টি কার্গোর মূল্যবৃদ্ধির হিসাব করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজির দাম ১৫ ডলার থেকে বেড়ে ২৩ ডলার হওয়ায় ব্যবধান দাঁড়িয়েছে ৮ ডলার। এই হিসাবে অতিরিক্ত ব্যয় প্রায় ৯ হাজার ৫৮৮ কোটি টাকা।
দুটি হিসাব যোগ করলে অতিরিক্ত ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৪১ হাজার ৩৪৮ কোটি টাকা (১ ডলার= ১২৩ টাকা হিসেবে)।
তবে এটি নথিতে উল্লিখিত কার্গোর সংখ্যা, মূল্য ও বিনিময় হার ধরে করা ব্যয়ের প্রাক্কলন। পুরো অর্থবছরে সরকারের চূড়ান্ত ভর্তুকি ব্যয় ঠিক একই পরিমাণ হবে- এমনটি নিশ্চিত নয়। প্রকৃত ব্যয় নির্ভর করবে কার্গোর সংখ্যা, ক্রয়মূল্য, সরবরাহ পরিস্থিতি, বিনিময় হার এবং দেশীয় বাজারে গ্যাস বিক্রি থেকে পাওয়া আয়ের ওপর।
বরাদ্দের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি ভর্তুকি
এলএনজি আমদানির বাড়তি ব্যয়ের চাপ ইতোমধ্যে সরকারি হিসাবেও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। চলতি অর্থবছরে এই খাতে ৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ থাকলেও চলতি বছরের জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ভর্তুকি বাবদ ব্যয় হচ্ছে ২৫ হাজার কোটি টাকা।
এর আগে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এলএনজি আমদানিতে ভর্তুকি ব্যয় হয়েছিল প্রায় ১৪ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। তার আগের অর্থবছরে এ ব্যয় ছিল ৮ হাজার ৯০০ কোটি টাকা। দুই বছরের ব্যবধানে ভর্তুকির পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমদানি করা গ্যাসের প্রকৃত ব্যয় এবং দেশীয় বাজারে বিক্রির মূল্যেও বড় ব্যবধান তৈরি হয়েছে। এই ব্যবধান পূরণে সরকারকে ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। ফলে গ্যাসের সরবরাহ সচল রাখার জন্য যে অর্থ ব্যয় হচ্ছে, তা বাজেটের অন্য খাতে অর্থায়নের ওপরও চাপ তৈরি করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
গ্যাসের সংকট, তবু আমদানি কমানোর সুযোগ সীমিত
বাংলাদেশের নিজস্ব গ্যাস উৎপাদন দীর্ঘদিন ধরেই চাহিদার তুলনায় কম। বিদ্যুৎকেন্দ্র, শিল্পকারখানা, সার কারখানা এবং অন্য গ্রাহকের চাহিদা মেটাতে আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে।
এ অবস্থায় আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লেও এলএনজি আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেওয়ার সুযোগ সীমিত। আমদানি কমালে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে, শিল্পকারখানায় গ্যাসের সংকট বাড়তে পারে এবং উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যেতে পারে। আবার বেশি দামে গ্যাস কিনলে সরকারের ভর্তুকির চাপ বাড়ে।
অর্থাৎ, সরকারকে একই সঙ্গে দুটি ঝুঁকি সামলাতে হচ্ছে- একদিকে গ্যাসের সরবরাহ বজায় রাখা, অন্যদিকে বাড়তি আমদানি ব্যয় মেটানো। সরবরাহ ঘাটতি ও উচ্চমূল্য দীর্ঘস্থায়ী হলে এ সংকট আরও জটিল হতে পারে।
ডলার ও বাজেট ব্যবস্থাপনায় বাড়তি চাপ
এলএনজি আমদানির মূল্য ডলারে পরিশোধ করতে হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি টাকার অবমূল্যায়ন হলে একই পরিমাণ গ্যাস কিনতে আরও বেশি টাকা প্রয়োজন হয়। এতে দেশের অর্থনীতি আরও চাপের মুখে পড়তে পারে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) অর্থ পরিদপ্তরের পরিচালক এ কে এম মিজানুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘বছর এখনো শেষ হয়নি, তাই এখন ভর্তুকির হিসাব করা সম্ভব নয়। জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত এই পাঁচ মাসে আমরা যে এলএনজি সরবরাহ নিশ্চিত করেছি তাতে ২৫ হাজার কোটি টাকার মতো ভর্তুকি লাগছে। কারণ ডিসেম্বরের কার্গো এখনো কেনা বাকি। কেমন দামে কিনতে হবে সেটিও নিশ্চিত নয়।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. বদরূল ইমাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘এই পরিস্থিতি থেকে একদিনে বের হওয়া সম্ভব নয়। দীর্ঘমেয়াদে পরিকল্পনা নিতে হবে। আমাদের দেশি গ্যাসের অনুসন্ধান এবং উত্তোলন বাড়াতে হবে। ভূতাত্ত্বিকভাবে মনে করি আমাদের দেশে গ্যাস সম্পদের প্রাচুর্য আছে। এই সম্পদকে আমাদের কাজে লাগাতে হবে। তাহলে এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ সম্ভব।’
এই জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘পাশাপাশি আমাদের নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। এখানকার সূর্যের তাপ-আবহাওয়া নবায়নযোগ্য জ্বালানির জন্য উপযোগী। ইউরোপের অনেক দেশে আমাদের মতো সানশাইন নেই। তারা অনেক বেশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন করছে। আমাদের এদিকে এগোতে হবে। তাহলে ধীরে ধীরে আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থাপনা থেকে বের হয়ে আসতে পারবো।’

