ডেইলি নারায়ণগঞ্জ টুয়েন্টিফোর ডটকমঃ রাজধানীর উপকণ্ঠে নারায়ণগঞ্জ-২ (আড়াইহাজার) আসন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসনে জামায়াতে ইসলামীর বিপুল ভোটপ্রাপ্তি উপজেলাবাসীকে বিস্মিত করেছে। নির্বাচনের পর থেকে এ নিয়ে সচেতন মহলে চলছে আলোচনা ও বিশ্লেষণ।
নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানে এরশাদ সরকারের পতনের পর থেকে দেশে এ পর্যন্ত ৯টি জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়েছে। এর মধ্যে জামায়াত ১৯৯১, ১৯৯৬ সালের দুটি এবং ২০২৬ সালের নির্বাচনে এককভাবে অংশ নেয়। ২০০১, ২০০৮ ও ২০১৮ সালের ভোট তারা করেছে বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধভাবে। আর ২০১৪ ও ২০২৪ সালের নির্বাচন বিএনপির মতোই বর্জন করে জামায়াত।
নারায়ণগঞ্জ-২ (আড়াইহাজার) আসনে ১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াত পেয়েছিল ১২ হাজার ১০০ ভোট আর ৯৬-র নির্বাচনে দলটির প্রার্থী অধ্যাপক ইলিয়াছ মোল্লা ৮ হাজার ১১ ভোট পেয়ে পঞ্চম হয়েছিলেন। ত্রিশ বছরের ব্যবধানে গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলটি পেয়েছে ৮১ হাজার ৫৪ ভোট। এবার দলটির প্রার্থী অধ্যাপক ইলিয়াছ মোল্লা বিএনপির প্রার্থীর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে অবতীর্ণ হন। জামায়াতের এই ভোটের সংখ্যা উল্লম্ফনে বিস্মিত উপজেলা ভোটার, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সুশীল সমাজ।
এই আসনে জামায়াতের প্রার্থী ও জেলার সমাজকল্যাণ সম্পাদক অধ্যাপক ইলিয়াছ মোল্লা জানান, আড়াইহাজার উপজেলায় জামায়াতের তিন হাজারের মতো পদবিধারী কর্মীবাহিনী রয়েছেন। তাদের মধ্যে ১২০ জন রোকন ও ১৮ জন কর্মপরিষদ সদস্য। পুরো উপজেলাকে উত্তর ও দক্ষিণ অঞ্চলে ভাগ করে পৃথক আমির ও সেক্রেটারি জেনারেলকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রত্যেক ইউনিয়ন, পৌরসভা ও ওয়ার্ড পর্যায়ে তাদের কার্যকরী কমিটিসহ সক্রিয় নেতাকর্মী রয়েছেন। এর বাইরেও রয়েছেন বিপুলসংখ্যক সমর্থক।
এই কর্মীবহর নিয়ে একটি জাতীয় নির্বাচনে জামায়াতের এত বিপুল ভোটপ্রাপ্তি এখন উপজেলাজুড়ে আলোচনায় উঠে এসেছে। অনেকে এটিকে স্বাভাবিক মনে করলেও অনেকে নানা যুক্তি দেখিয়ে প্রাপ্ত ভোট নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করছেন।
উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জুয়েল আহাম্মেদ বলেন, ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং করে ভোট বাড়িয়েছে জামায়াত। নতুবা আড়াইহাজার উপজেলায় জামায়াতের ১২ থেকে ১৪ হাজারের বেশি ভোট পাওয়ার কথা নয়। আওয়ামী লীগের ভোটও জামায়াতে পড়েছে বলে মনে করেন তিনি।
তবে নারায়ণগঞ্জ জেলা জামায়াতের সমাজকল্যাণ সম্পাদক অধ্যাপক ইলিয়াছ মোল্লা বলেন, নির্বাচন ঘিরে সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা ও প্রতিকূল পরিবেশে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাওয়ার দক্ষতার কারণে মানুষের মন জয় করে নিয়েছে জামায়াত। সমাজ থেকে ঘুষ, দুর্নীতি, জুয়া, মাদকসহ অপরাধমূলক কাজ বন্ধে ইসলামী অনুশাসন প্রয়োজন। জামায়াত আল্লাহর এই জমিনে তাঁর দ্বীন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এসব অপরাধমূলক কাজ বন্ধে কার্যকর পরিকল্পনা দিয়ে ভোটারদের আকৃষ্ট করায় আমাদের ভোট বেড়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সরকারি সফর আলী কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ আবুল কাসেম মোল্লা সমকালকে বলেন, এ দেশের মানুষ ধর্মভীরু। আর ধর্মের টোপ দিয়ে সাধারণ মানুষকে দুর্বল করে কোনো কোনো দল। তিনি আরও বলেন, জামায়াত এখনও একাত্তরকে বিশ্বাস করে না। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা লালন করে না। যারা এ দেশকে ধারণ করে না, তাদের উত্থান জাতির জন্য অশনিসংকেত। বাংলাদেশের মতো একটি দেশে ধর্মীয় গোষ্ঠীর উত্থান হলে সার্বিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে পড়বে। ধর্মীয় উগ্রবাদ মাথাচাড়া দেওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এই ব্যাপারে রাজনৈতিক সামাজিক সাংস্কৃতিক সর্বোপরি প্রগতিশীল মানুষদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা জরুরি।
রাজনৈতিক সচেতন মহল মোটা দাগে জামায়াতের এমন উত্থানের পাঁচটি কারণ চিহ্নিত করেছেন।
নারী কর্মীদের প্রচারে নারী ভোটার আকৃষ্ট
তপশিলের অনেক আগেই নারায়ণগঞ্জ-২ আসনে জামায়াত ইলিয়াছ মোল্লাকে তাদের প্রার্থী ঘোষণা করে। ওই সময় বিএনপির চারজন মনোনয়নপ্রত্যাশী একে অন্যের বিরুদ্ধে দ্বন্দ্বে ব্যস্ত ছিলেন। এই সুযোগে জামায়াত তাদের নারীকর্মীদের প্রথমবারের মতো নির্বাচনে মাঠে নামিয়ে প্রচারের কাজে লাগায়। নারীকর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে ‘ইনসাফ কায়েমের’ বয়ান দিয়ে সহজসরল নারী ভোটারদের আকৃষ্ট করতে সক্ষম হন। গত বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত ভোটের পর গণনায় দেখা যায় প্রতিটি কেন্দ্রে নারীদের বুথে পড়া ভোটের সত্তর শতাংশই গেছে দাঁড়িপাল্লায়।
শৃঙ্খলাবদ্ধ অভ্যন্তরীণ কাঠামো
জামায়াতের শৃঙ্খলাবদ্ধ অভ্যন্তরীণ কাঠামো বিশেষ করে স্থানীয় পর্যায়ে তাদের সাংগঠনিক কার্যক্রম ছিল চোখে পড়ার মতো। যে কোনো মিছিল সভা সমাবেশে তাদের কর্মী-সমর্থকরা ছিল অনেক সংঘবদ্ধ। এসবও ভোটারদের মাঝে প্রভাব ফেলে।
যত্রতত্র মাদ্রাসা
আড়াইহাজারে প্রত্যন্ত অঞ্চলে গড়ে উঠেছে যত্রতত্র মাদ্রাসা। উপজেলা প্রশাসনের কাছে এর সঠিক হিসাব না থাকলেও বিভিন্ন সূত্রের বরাতে জানা গেছে, এ অঞ্চলে পাঁচ শতাধিক মাদ্রাসা রয়েছে। এ মাদ্রাসাগুলোর শিক্ষক শিক্ষার্থীসহ সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলো জামায়াতের ভোট বাড়াতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও নির্বাচন কমিশন আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে অংশ নিতে না দেওয়ার কারণে আগে থেকেই জামায়াত এককভাবে নির্বাচনের জন্য পরিকল্পনা সাজায়। আড়াইহাজারে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী সমর্থকদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা-হামলায় জড়িত না থাকায় একটি অংশের সহানুভূতি পেতে সক্ষম হয় জামায়াত। অনেকের ধারণা, যেহেতু ব্যালটে নৌকা মার্কা নেই আওয়ামী লীগের যে অংশটি বিএনপিকে সমর্থন করে না তারা জামায়াতের ভোট বৃদ্ধিতে সহায়তা করেছেন।
বিএনপির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব
নির্বাচনী তপশিলের পর বিএনপির প্রার্থী তালিকায় যোগ্য আর অযোগ্যদের মূল্যায়ন নিয়ে দলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব প্রকট আকার ধারণ করে। ফলে বিএনপির প্রার্থী নজরুল ইসলাম আজাদ দলের মনোনয়নবঞ্চিত নেতাদের অনুসারীদের প্রচারে যুক্ততা নিশ্চিত করতে পারলেও বঞ্চিত নেতারা মাঠে কাজ করেননি। তাদের মধ্যে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়ে কলস প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন জেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য আতাউর রহমান আঙ্গুর। দ্বিধাবিভক্ত বিএনপির সমর্থকের একাংশ নিজেদের নিরাপদ ভেবে জামায়াতকে সমর্থন দেয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সরকারি সফর আলী কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ আবুল কাসেম মোল্লা বলেন, জামায়াত নিজেদের বাংলাদেশের ইসলামের স্বার্থরক্ষার লড়াইয়ে পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের এক ‘মজলুম’ হিসেবে উপস্থাপন করেছে। এই মজলুম ন্যারেটিভ বহু ধর্মপ্রাণ মানুষের মধ্যে আবেগ ও সহানুভূতির জায়গা তৈরি করেছে, যা পরে রাজনৈতিক সমর্থনে রূপান্তরিত হয়েছে। জামায়াতের নেতারা নিয়মিত মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীরা ইনসাফ, সততা, সামাজিক ন্যায়বিচার, এই শব্দগুলো সামনে এনেছেন। ভোটাররা ধর্মের চেয়ে ধর্মের ভাষায় বলা এই নৈতিক প্রতিশ্রুতিগুলোকেও অনেক ক্ষেত্রে নারী ভোটারদের সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করতে সক্ষম হয়েছে। এ ছাড়াও জামায়াত রক্ষণশীল ডানপন্থি পরিচয় থেকে মধ্য-ডানপন্থি দল হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার চেষ্টা করেছে এবং অনেকাংশে সফল হয়েছে।
গবেষক ও প্রাবন্ধিক বীর মুক্তিযোদ্ধা রুহুল আমিন বাবুল বলেন, জামায়াতের ভোটবৃদ্ধির বড় কারণ হলো ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক ন্যারেটিভের লড়াই। ধর্ম মানুষের মনোজগতে অবশ্যই প্রভাব ফেলে। কিন্তু সেই প্রভাবটা অনেক সময় সরাসরি ভোটে যায় না; এটা যায় রাজনৈতিক মনস্তত্ত্বে, যা পরে ভোটে রূপ নিতে পারে। জামায়াতের সাংগঠনিক শৃঙ্খলা এ ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা পালন করেছে। এলাকার মাদ্রাসাগুলোও তাদের ভোটব্যাংক হিসেবে বেশ কাজ করেছে।

