ডেইলি নারায়ণগঞ্জ টুয়েন্টিফোর ডটকমঃ প্রথমবার নারী ফুটবল লিগে নাম লিখিয়েই বাজিমাত করেছে রাজশাহী স্টারস। দশে দশ জয়- নিরঙ্কুশ সাফল্যে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয়ে রীতিমতো অভিষেকেই ইতিহাস গড়েছে পদ্মাপাড়ের ক্লাবটি। যেখানে ২৯ গোল করে বড় ভূমিকা আলপি আক্তারের। ঋতুপর্না চাকমা, আফঈদা খন্দকার, তৃষ্ণা রানী, সুরভী প্রীতি, স্বপ্না রানীর মতো তারকার ভিড়ে নিজেকে আলাদা করে চিনিয়েছেন সদ্যই অনূর্ধ্ব-১৯ বয়স ভিত্তিক থেকে আসন্ন এশিয়া কাপের জাতীয় দলে জায়গা করে নেওয়া প্রতিভাবান এ ফুটবলার। বাংলাদেশের নারী ফুটবল লিগের ইতিহাসে এক মৌসুমে সর্বোচ্চ ৩৫ গোলের রেকর্ড সাবিনা খাতুনের। ২০১৯-২০২০ মৌসুমে এ কীর্তি গড়েছিলেন ‘গোল মেশিন খ্যাত’ এক সময়ের জাতীয় দলের অধিনায়ক ও দেশসেরা ফরোয়ার্ড। আলপির ২৯ গোল ২০১২-২০১৩ মৌসুমে সাবেক তারকা অং ¤্রচিং মারমার সঙ্গে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। অথচ দিনাজপুর থেকে উঠে আসা অমিত প্রতিভাবান এ ফুটবলারের হাতেখড়ি গোলরক্ষক হিসেবে। স্কুল জীবনের কোচের পরামর্শে হয়ে উঠেছেন স্ট্রাইকার।
স্কুল পর্যায়ে অ্যাথলেটিকসে লং জাম্প আর হাই জাম্পে প্রথম হওয়ার পর কোচ মোফাজ্জল হোসেন বিপুলের চোখে ধরা পড়ে আলপির প্রতিভা,‘আলপি যখন তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে, তখন ও অ্যাথলেটিকসে চ্যাম্পিয়ন। ওকে বললাম, ফুটবলও খেল। শুরুতে গোলকিপার হিসেবে খেলালেও আমি দেখলাম ওর দৌড়ানোর গতি আর মুভমেন্ট দুর্দান্ত। তখনই ওকে গোলপোস্ট থেকে তুলে স্ট্রাইকার হিসেবে গড়ে তুললাম।’ সংবাদ মাধ্যমে বলছিলেন তিনি। আলপির লক্ষ্যও ছিল দুর্দান্ত স্ট্রাইকার হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলা, লিগে দুর্দান্ত পারফর্ম্যান্সে রাজশাহীকে চ্যাম্পিয়ন করার পর নিজেই জানিয়েছিলেন,‘সিনিয়রদের সঙ্গে খেলার সময় বলত, তুই গোলকিপারে দাঁড়া, আমরা উপরে খেলি। সবাই দেখি গোল দেওয়ার চেষ্টা করে, তখনই মনে হলো গোলকিপার হওয়ার চেয়ে স্ট্রাইকার হওয়ার চেষ্টা করব।’ দেড় বছর আগের লিগে সিরাজ স্মৃতি সংসদের হয়ে খেলেছিলেন আলপি। ১১ গোল করেও আসতে পারেননি পাদপ্রদীপের আলোয়। এবার সবাইকে ছাপিয়ে গেলেন দারিদ্র্যজয়ী এ ফুটবলার। যদিও পথটা সহজ ছিল না। কোচ বিপুল যেমন বলেছেন,‘তিন মাস ওকে অনেক বকাঝকা করেছি আর কঠোর অনুশীলন করিয়েছি। ওর মধ্যে শৃঙ্খলার অভাব ছিল, সেটা ঠিক করেছি। আমি জানতাম সে ২৯ গোল করার সামর্থ্য রাখে।’ সাফল্যের সেই মন্ত্র আলপিও ভোলেননি, ‘বাড়িতে ফিরে একাডেমির হয়ে অনেক ম্যাচে গোল পাচ্ছিলাম না, খুব খারাপ দিন যাচ্ছিল। তখন একা একা মাঠে যেতাম, আগে আগে গিয়ে অনুশীলন করতাম। অনেক চেষ্টা করতাম।’ পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলায় বেড়ে ওঠা আলপি এবারের এসএসসি পরীক্ষার্থী। বাবা আতাউর রহমানের চায়ের দোকানের আয়েই চলে সংসার। ফুটবল খেলতে গিয়ে দারিদ্র্য আর সমাজের টিপ্পনীÑসবই ছিল আলপির নিয়মিত সঙ্গী। তবে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন বড় ভাই নূর আলম। ভাইয়ের প্রতি আলপির তাই কৃতজ্ঞতার শেষণ নেই,‘আমার ভাই আমাকে অনেক সাপোর্ট করে। এ পর্যন্ত আসছি কোচের হাত ধরে, ফ্যামিলি থেকে সাপোর্ট না দিলে তো সম্ভব হতো না। কোচের মতো আমার ভাইয়ের অবদানও অনেক।’ লিগে সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়ে পাওয়া ৫০ হাজার টাকা প্রাইজমানি হাতে পাওয়ার পর সেটা পরিবারের হাতেই তুলে দিতে চান আলপি। তবে তাঁর স্বপ্ন এখন নীল সীমানার ওপারে। কোচ বিপুল তাঁকে ডাকেন ‘আগামীদিনের সাবিনা খাতুন’ বলে। সাবিনা অবশ্য এখন আর জাতীয় দলের বৃত্তে নেই। তাঁকে বাইরে রেখে নতুনদের বড় অভিজ্ঞতার স্বাদ দিতে আগ্রহী কোচ পিটার বাটলার। তাই তো প্রথমবারের মতো জাতীয় দলে ডাক দিয়েছেন আলপিকে। আলপিও উন্মুখ হয়ে আছেন নিজের সেরাটা দিতে। ২০ ফেব্রুয়ারি প্রথমবারের মতো এশিয়ান কাপ খেলতে অস্ট্রেলিয়ায় যাবে বাংলাদেশ দল। দলে থাকার নিশ্চয়তা পেয়ে আলপিও রোমাঞ্চিত, ‘সাবিনা আপুর মতো দেশের মানুষের মন জয় করতে চাই। জাতীয় দলে ডাক পেয়ে অনেক ভালো লাগছে। এশিয়ান কাপে যদি কোনো সুযোগ পাই মাঠে নিজের শতভাগ দেব।’
এশিয়ান কাপের সবুজ গালিচায় পা রাখার অপেক্ষায় থাকা আলপি যেন মনে করিয়ে দিচ্ছেন- ইচ্ছা আর পরিশ্রম থাকলে চায়ের দোকান থেকেও স্বপ্নের আলপনা আঁকা যায়।
অদম্য আলপির স্বপ্ন যাত্রার গল্প

