ডেইলি নারায়ণগঞ্জ টুয়েন্টিফোর ডটকমঃ নারায়ণগঞ্জের দুটি আসনে বিএনপির প্রভাবশালী বিদ্রোহী প্রার্থীদের সামলে নিয়ে বিজয়ের মুকুট ঘরে তুলে নিয়েছেন ধানের শীষের প্রার্থীরা। নারায়ণগঞ্জ-২ (আড়াইহাজার) থেকে নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপির ঢাকা বিভাগীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক নজরুল ইসলাম আজাদ। তিনি পেয়েছেন ১ লাখ হাজার ২৪ হাজার ২৯১ ভোট। আর বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত স্বতন্ত্র প্রার্থী আতাউর রহমান খাঁন আঙ্গুর ১৮ হাজার ৭৪৪ ভোট পেয়ে তৃতীয় হয়েছেন।
নারায়ণগঞ্জ-৩ (সোনারগাঁ-সিদ্ধিরগঞ্জ) আসনে বিএনপি প্রার্থী আজহারুল ইসলাম মান্নান ১ লাখ ৫৫ হাজার ৪০০ ভোট পেয়ে বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হয়েছেন। ওই আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী, সাবেক সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি মুহাম্মদ গিয়াসউদ্দিন ২০ হাজার ৩৭৯ ভোট পেয়ে হয়েছেন তৃতীয়। আরেক বিদ্রোহী প্রার্থী সাবেক মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক রেজাউল করিম ৪ হাজার ৫৯৬ ভোট পেয়ে জামানত হারিয়েছেন। তাদের ভরাডুবি নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।
নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনে আজহারুল ইসলাম মান্নান মনোনয়ন পাওয়ার পর বিদ্রোহী দুই প্রার্থী নিয়ে বেকায়দায় পড়েন। এই আসনে অধ্যাপক রেজাউল করিম ও মুহাম্মদ গিয়াসউদ্দিনসহ আটজন বিএনপির মনোনয়ন চেয়েছিলেন। কিন্তু দলটির নীতিনির্ধারকরা ত্যাগী মান্নানকে মনোনয়ন দেন। ফলে সাত প্রার্থী মান্নানের মনোনয়ন বাতিল চেয়ে আবেদন করেন। পরে আজহারুল ইসলাম মান্নান সাত প্রার্থীর বাড়ি গিয়ে পাঁচজনকে বুঝিয়ে নির্বাচনে তাঁর পক্ষে নিয়ে আনেন। বাকি দুই বিদ্রোহী প্রার্থী নিজেদের হেভিওয়েট মনে করে নির্বাচনী মাঠে থেকে যান।
উপজেলা বিএনপির একাধিক শীর্ষ নেতা জানিয়েছেন, মান্নান বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মামলা, হামলা ও জেল-জুলুমের শিকার হন। পাশাপাশি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা হলে ও জেলে গেলে তাদের পরিবারকে আর্থিক সহযোগিতা করতেন। ১৭ বছর লাইফ সাপোর্টে থাকা বিএনপিকে বাঁচিয়ে রেখেছেন তিনি। এতে তাঁর বিশাল কর্মী বাহিনী তৈরি হয়। মান্নানের কর্মী বাহিনীই তাঁকে নির্বাচনী মাঠে জয়ের বন্দরে পৌঁছে দেন।
নির্বাচনী মাঠে বিএনপি প্রার্থী আজহারুল ইসলাম মান্নান ও জামায়াতের প্রার্থী ইকবাল হোসাইন ভূঁইয়ার মধ্যে তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়। এখানে দাঁড়িপাল্লার চেয়ে ২০ হাজার ৪৮২ ভোট বেশি পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন মান্নান।
সোনারগাঁ উপজেলা বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি কাজী নজরুল ইসলাম টিটু জানান, ১৭ বছর বিএনপির দুই বিদ্রোহী প্রার্থী আরাম-আয়েশে জীবনযাপন করেছেন। একটি মামলাও তাদের ছুঁতে পারেনি। অথচ বিএনপি নেতাকর্মীদের বটবৃক্ষের মতো ছায়া দিয়ে আগলে রেখেছেন আজহারুল ইসলাম। মামলার জামিন থেকে শুরু করে সংসার খরচ চালিয়েছেন। সেই ত্যাগই মান্নানকে জয়ী করেছে।
জামপুর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আল মুজাহিদ মল্লিক বলেন, তিনিও মনোনয়ন পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ছিলেন। পরে দল মান্নানকে মনোনয়ন দেওয়ায় নির্বাচন থেকে সরে এসেছেন। মান্নানের হয়ে নির্বাচনী মাঠ গুছিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করে জয় নিয়ে এসেছেন।
নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য আজহারুল ইসলাম ভাষ্য, দলীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ ভোটাররা তাঁকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করায় তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ। বিএনপির দুর্দিনে যেমন নেতাকর্মীদের পাশে ছিলেন, আগামীতেও পাশে থাকবেন।
এদিকে বিএনপির প্রার্থী ঘোষণার দিন থেকেই আড়াইহাজারে দলীয় কোন্দল প্রকাশ্যে আসতে শুরু করে। নারায়ণগঞ্জ-২ আসনে বিএনপির ঢাকা বিভাগীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক নজরুল ইসলাম আজাদকে মনোনয়ন দেওয়া হয়। এরপর থেকে মনোনয়ন পরিবর্তনের জন্য মনোনয়ন বঞ্চিত বিএনপির সহঅর্থনৈতিক সম্পাদক মাহমুদুর রহমান সুমন, সাবেক সংসদ সদস্য আতাউর রহমান আঙ্গুর ও কেন্দ্রীয় মহিলা দলের সাংগঠনিক সম্পাদক পারভীন আক্তার এক মঞ্চে উঠে তাদের মধ্য থেকে একজনকে মনোনয়ন দেওয়ার দাবি জানান। দল শেষ পর্যন্ত নজরুল ইসলাম আজাদকে চূড়ান্ত মনোনয়ন দেয়। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে আতাউর রহমান স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামেন। ব্যক্তিগত ইমেজ নিয়ে নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে চাইলেও তিন কারণে তাঁর ভরাডুবি হয়।
কর্মী-সমর্থকদের বলয় ত্যাগ
চূড়ান্ত মনোনয়ন দেওয়ার পর থেকে নজরুল ইসলাম আজাদ ও তাঁর সহোদর রাকিবুল ইসলাম মনোনয়নবঞ্চিত নেতাদের অনুসারীদের নিজের বলয়ে নিতে সক্ষম হন। মনোনয়নবঞ্চিত কেন্দ্রীয় মহিলা দলের সাংগঠনিক সম্পাদক পারভীন আক্তারের বলয়ে থাকা নারায়ণগঞ্জ জেলা যুবদলের সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি সালাউদ্দিন মোল্লা ও উপজেলা জাসাসের সাধারণ সম্পাদক আরাফাত রহমান সিদ্দীক, মাহমুদুর রহমান সুমনের বলয়ে থাকা জেলা যুবদলের সাবেক সহসভাপতি আমানউল্লাহ আমান, উপজেলা যুবদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবু হানিফ রিমন, আড়াইহাজার পৌরসভা যু্বদলের সভাপতি শফিকুল ইসলাম সবুজ, আতাউর রহমান আঙ্গুরের বলয়ে থাকা নারায়ণগঞ্জ জেলা তাঁতী দলের সহসভাপতি মুজিবুর রহমান ও আড়াইহাজার পৌরসভা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান মনিরসহ পদধারী এবং পদবিহীন ক্ষুব্ধ কর্মী-সমর্থকরা আশান্বিত হয়ে বিএনপি প্রার্থীকে বিজয়ী করতে কাজ করা শুরু করেন। এতে শুরুতে সঙ্গে থাকা বিএনপি নেতাকর্মী পরে প্রচারে অংশ না নেওয়ায় নেতৃত্বশূন্য হয়ে পড়েন আতাউর রহমান আঙ্গুর।
আওয়ামী লীগের ভোটারদের ওপর নির্ভরতা
অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে অংশ নিতে না দেওয়ায় আতাউর রহমান আওয়ামী লীগের ভোট ব্যাংক নিজের আয়ত্তে আনার জন্য চেষ্টা করতে থাকেন। শুরু থেকে সমর্থন পেলেও দিন যত গড়াতে থাকে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীকে ঠেকাতে প্রকাশ্যে গোপলদী পৌরসভার মেয়র এম এ হালিম সিকদার, উপজেলা যুব ও ক্রীড়াবিষয়ক সম্পাদক আব্দুল লতিফ মোল্লা, আড়াইহাজার পৌরসভার সাবেক মেয়র হাবিবুর রহমান, মাহমুদপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আমানউল্যাহ আমান, উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি মেহের আলী মোল্লা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক রফিকুল ইসলাম, যুবলীগ সভাপতি আহাম্মেদুল কবির উজ্জ্বল, ব্রাহ্মন্দী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোফাজ্জল হোসেন খোকাসহ আওয়ামী লীগের একটি অংশ নজরুল ইসলাম আজাদের পক্ষে কাজ করায় ভোটের হিসাবনিকাশ পাল্টে যায়।
নির্বাচনের আগের রাতে গুজব
ভোটের আগে বুধবার রাত ৯টার দিকে হঠাৎ সামাজিক মাধ্যমে খবর ছড়িয়ে পড়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী আতাউর রহমান নারায়ণগঞ্জ-২ আসনের ধানের শীষের প্রার্থী নজরুল ইসলাম আজাদকে সমর্থন জানিয়ে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ালেন। রাত ১২টার দিকে ফেসবুক লাইভে এসে এই খবর ডাহা মিথ্যা বলে ঘোষণা দেন আতাউর রহমান। তবে গুজবের প্রভাব থেকে যায় নির্বাচনে।
আতাউর রহমান আঙ্গুরের বক্তব্য
নির্বাচনে ভরাডুবির বিষয়ে একাধিক কারণ উল্লেখ করে আতাউর রহমান আঙ্গুর বলেন, ভোটের আগের রাতে তিনি ধানের শীষকে সমর্থন দিয়েছেন এমন খবর ফেসবুকে ছড়িয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে তাঁর ভোট নষ্ট করা হয়েছে। তাঁর ভোটারদের হুমকি-ধমকি দেওয়া হয়েছে।
তবে তাঁর অভিযোগগুলো গালগপ্পো বলে উড়িয়ে দিয়েছেন উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জুয়েল আহম্মেদ। তাঁর ভাষ্য, নজরুল ইসলাম আজাদ ধীরে ধীরে নিজেকে বিএনপির যোগ্য সংগঠক হিসেবে গড়ে তোলেন। এসব কারণেই দল তাঁকে মনোনয়ন দেয়। এলাকাবাসীও তাঁকে বিপুল ভোটে বিজয়ী করেছে।

