ডেইলি নারায়ণগঞ্জ টুয়েন্টিফোর ডটকমঃ ‘‘জাতিসংঘের অধীনে শরিফ ওসমান হাদি হত্যার তদন্ত ও হত্যার ঘটনায় জড়িতদের বিচারের দাবিতে ইনকিলাব মঞ্চের অবস্থান কর্মসুচি ঘিরে রাজধানীতে পুলিশ ও ইনকিলাব মঞ্চের নেতাকর্মীদের দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়।
এ ঘটনায় ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আবদুল্লাহ আল জাবের ও রাকসুর জিএস সালাউদ্দিন আম্মার ও ঢাকা-১৮ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী মহিউদ্দিন রনিসহ অন্তত ৭৩ জন আহত হয়েছেন। তারা ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
শহীদ শরীফ ওসমান হাদি হত্যার বিচার ও জাতিসংঘের অধীনে তদন্তের দাবিতে শুক্রবার বিকাল থেকেই উত্তাল ছিল শাহবাগ ও ইন্টারকন্টিনেন্টাল মোড় এলাকা। বিকালে প্রথম দফা সংঘর্ষের পর সন্ধ্যায় নেতাকর্মীরা পুনরায় শাহবাগ মোড়ে অবস্থান নেন। পুলিশ তাদের রাস্তা ছেড়ে দেওয়ার অনুরোধ করলে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে পুলিশ লাঠিচার্জ শুরু করলে আন্দোলনকারীরাও ইটপাটকেল ছোড়ে। পরে পুলিশ টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়ে এলাকাটি নিয়ন্ত্রণে নেয়।শুক্রবার প্রথমে জুমার নামাজের পর শাহবাগ থেকে প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনা অভিমুখে পদযাত্রা শুরু করেন ইনকিলাব মঞ্চের কর্মীরা। ইন্টারকন্টিনেন্টাল মোড়ে পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে সামনে এগোতে চাইলে জলকামান ও টিয়ারগ্যাস ব্যবহার করে পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। ধারাবাহিক সংঘর্ষে পুরো শাহবাগ এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।
এর আগে শুক্রবার সকালে প্রথমে ইন্টার-কন্টিনেন্টাল মোড়ে অবস্থান নিয়ে আন্দোলন থেকে যমুনা অভিমুখে যাত্রার ঘোষণা দেন ইনকিলাব মঞ্চের নেতাকর্মীরা। পরে ৩টা ৫০ মিনিটের দিকে ইন্টার-কন্টিনেন্টাল মোড় থেকে যমুনা অভিমুখে যাওয়ার সময় পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে সামনে এগিয়ে যেতে গেলে পুলিশ তাদের বাধা দেয়। এ সময় আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ জলকামান, টিয়ার গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। উভয়পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ায় ইন্টারকন্টিনেন্টাল থেকে বাংলামোটর মোড় পর্যন্ত রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। এই হামলার প্রতিবাদে ইনকিলাব মঞ্চ বিপ্লব উদ্যানে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালনের নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বিকেলে ইনকিলাব মঞ্চের নেতাকর্মীরা শাহবাগ থেকে প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনার অভিমুখে পদযাত্রা শুরু করেন। মিছিলটি ইন্টার-কন্টিনেন্টাল মোড়ে পৌঁছলে পুলিশ কাঁটাতারের ব্যারিকেড দিয়ে পথরোধ করে। একপর্যায়ে আন্দোলনকারীরা ব্যারিকেড ভেঙে সামনে এগিয়ে যেতে চাইলে পুলিশ চড়াও হয়। শুরু হয় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ার শেল, সাউন্ড গ্রেনেড ও লাঠিচার্জ শুরু করলে রণক্ষেত্রে পরিণত হয় এলাকাটি। আন্দোলনকারীরাও পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছোড়ে। এ সময় সাউন্ড গ্রেনেডের স্পিøন্টারের আঘাতে কয়েকজনকে আহত হতে দেখেছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা, পরে তাদের হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে অন্তত ১০-১৫ জনকে প্রাথমিক চিকিৎসা নিতে দেখা গেছে। ডাকসু নেত্রী ফাতেমা তাসনিম জুমা ও জকসু নেত্রী শান্তা আক্তারকেও আহত অবস্থায় হাসপাতালে দেখা যায়। হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মো. ফারুক জানান, ‘তিনজনকে হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে, আরও অনেকেই এসেছেন। তবে কেউ গুলিবিদ্ধ নয়।
সংঘর্ষের পর আন্দোলনকারীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে গেলেও ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আবদুল্লাহ আল জাবের নেতাকর্মীদের পুনরায় শাহবাগে অবস্থান নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। মুখপাত্র হত্যার বিচারের পাশাপাশি আজকের হামলার প্রতিবাদে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করা হতে পারে বলে সংগঠনটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
বৃহস্পতিবার বিকেল থেকে সেখানে অবস্থান করলেও শুক্রবার তাদের হটিয়ে দেওয়ার পর অবস্থান নেয় বাংলামোটরে। পরে এখানেও সংগঠনটির নেতা-কর্মীদের সঙ্গে চলে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া। এভাবেই শুক্রবার দিনভর উত্তেজনা ও আতঙ্কের মাঝ দিয়ে কেটেছে ওই এলাকা। এ সময় আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ জলকামান ও টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করে। অবস্থান কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন শহীদ ওসমান হাদির স্ত্রী রাবেয়াা ইসলাম শম্পা, ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আবদুল্লাহ আল জাবের এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার মুখপাত্র ও ডাকসু নেত্রী ফাতিমা তাসনিম জুমা।
পুলিশ জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার রাতে হোটেল ইন্টার-কন্টিনেন্টালের সামনেও একদল মানুষ অবস্থান নিয়ে হাদি হত্যার বিচারের দাবিতে শ্লোগান দেন। তারা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে রাতভর সেখানে অবস্থান করেন। পরে শুক্রবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ইনকিলাব মঞ্চের ফেসবুক পেজে জানানো হয়, যমুনার সামনে অবস্থান কর্মসূচি অব্যাহত থাকায় পূর্বঘোষিত ‘ভ্যান র্যালি’ কর্মসূচি স্থগিত করা হয়েছে।
তবে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে ঢাকা-৮ আসনে ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী অবস্থান কর্মসূচিতে সংহতি প্রকাশ করেন। পুলিশ বিকেল থেকেই ঘটনাস্থলে অবস্থান নেয়।
শাহবাগে দ্বিতীয় দফা সংঘর্ষ, আহত ৫০ ॥ রাজধানীর শাহবাগে পুলিশ ও ইনকিলাব মঞ্চের নেতাকর্মীদের মধ্যে দ্বিতীয় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এ ঘটনায় ঢাকা-১৮ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী মহিউদ্দিন রনিসহ অন্তত ৪০ থেকে ৫০ জন আহত হয়েছেন।
শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টা ৫০ মিনিটের দিকে শাহবাগ মোড়ে অবস্থান নিয়ে আন্দোলনরত ইনকিলাব মঞ্চের নেতাকর্মীদের সরাতে গেলে এই সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ (পরিদর্শক) মো. ফারুক জানান, ‘হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল ও শাহবাগ এলাকা থেকে ইনকিলাব মঞ্চের প্রায় ৪০ জন নেতাকর্মী আহত হয়ে হাসপাতালে এসেছেন। জরুরি বিভাগে তাদের চিকিৎসা চলছে।’ আহতদের মধ্যে ঢাকা-১৮ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী মহিউদ্দিন রনিও রয়েছেন বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে প্রথম দফার সংঘর্ষের পর ইনকিলাব মঞ্চের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে জানানো হয়, তাদের সদস্য সচিব আবদুল্লাহ আল জাবের গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। এছাড়া ডাকসু নেত্রী ফাতেমা তাসনিম জুমা ও শান্তা আক্তারকে পুলিশি নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে বলে দাবি করা হয়। পোস্টে আপাতত বড় জমায়েত না করে আহতদের চিকিৎসার দিকে নজর দেওয়ার জন্য কর্মীদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়। তবে আহতদের চিকিৎসা দিয়ে আবারও রাজপথে আসার কথাও জানান তারা।
এর আগে জুমার নামাজের পর শাহবাগ থেকে প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনা অভিমুখে পদযাত্রা শুরু করেন ইনকিলাব মঞ্চের কর্মীরা। ইন্টারকন্টিনেন্টাল মোড়ে পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে সামনে এগোতে চাইলে জলকামান ও টিয়ারগ্যাস ব্যবহার করে পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। দিনের এই ধারাবাহিক সংঘর্ষে পুরো শাহবাগ এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত শাহবাগ এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছিল।
শাহবাগে অবরোধ, যান চলাচল বন্ধ ॥ রাজধানীর ইন্টার-কন্টিনেন্টাল মোড় এলাকায় পুলিশ ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে সংঘর্ষে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। শুক্রবার বিকেল সাড়ে ৩টা থেকে শুরু হওয়া এই ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া থেমে থেমে সন্ধ্যা সাড়ে ৫টা পর্যন্ত চলে। এ ঘটনায় শাহবাগ থেকে বাংলামোটর সড়কে প্রায় দুই ঘণ্টা যানবাহন চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ ছিল। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত শাহবাগ মোড় অবরোধ করে রেখেছে আন্দোলনকারীরা।
সন্ধ্যা ৬টার দিকে সরেজমিনে দেখা যায়, ইন্টার-কন্টিনেন্টাল মোড় থেকে বাংলামোটর পর্যন্ত সড়কজুড়ে ইটের টুকরা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। পুলিশ ও বিজিবি সদস্যরা সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। বাংলামোটরের ফুটওভার ব্রিজ ও আশপাশের ভবনের ছাদে উৎসুক মানুষের ভিড় দেখা গেছে। সন্ধ্যা গড়াতেই পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে পুলিশ ব্যারিকেড সরিয়ে নেয়। এতে কিছুক্ষণের জন্য যান চলাচল শুরু হলেও শাহবাগ অবরোধের ফলে যান চলাচল আবারও বন্ধ হয়ে যায়। ইনকিলাব মঞ্চ এই হামলার প্রতিবাদে বিক্ষোভ অব্যাহত রাখার কথা বলেছে।

