পাল্টাপাল্টি মহড়ায় ইরান-যুক্তরাষ্ট্র
ডেইলি নারায়ণগঞ্জ টুয়েন্টিফোর ডটকমঃ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই নিজেদের আকাশসীমা বন্ধ করেছে ইরান। সেই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি ও এর আশপাশে লাইভ ফায়ার মহড়া করার ঘোষণাও দিয়েছে দেশটির সরকার। সামা টিভি জানিয়েছে, ওইদিন থেকেই তিন দিনের মহড়া চালাচ্ছে তেহরান। এর মধ্যে ইরানের দিকে আরেকটি যুদ্ধজাহাজের বহর যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এ নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে দ্বিতীয় যুদ্ধজাহাজের বহর মোতায়েন করতে যাচ্ছে পেন্টাগন। এমন প্রেক্ষাপটে ওয়াশিংটন ঘোষণা দেয়, তারা মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক মহড়া চালাবে।
বৃহস্পতিবার বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম জানায়, এ মহড়া শুরু হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে ইরানে মার্কিন হামলার আশঙ্কায় মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তেজনা বৃদ্ধির মধ্যেই সমুদ্রের নিচে থাকা ক্ষেপণাস্ত্র টানেলের একটি নেটওয়ার্ক উন্মোচন করেছে ইরান। তেহরানের দাবি, এসব টানেলে শত শত দূরপাল্লার ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র মজুত রয়েছে। ইরানের ওপর কোনো হামলা হলে হরমুজ প্রণালি নিরাপদ থাকবে না বলেও সতর্ক করেছে দেশটি। খবর আলজাজিরা ও ইরনার।
মার্কিন হুমকির মুখে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিয়ে সৌদি যুবরাজকে ফোন করে সতর্ক করেছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট। তাদের ওই ফোনালাপে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান জানিয়েছেন, তেহরানে হামলায় আমাদের আকাশসীমা ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না। এর আগে গত মঙ্গলবার ইরান নোটিস টু এয়ারম্যান (নোটেম) জারি করে। সেই নোটিসে হরমুজ প্রণালি ও তার আশপাশের এলাকায় ভূপৃষ্ঠ থেকে ২৫ হাজার ফুট উচ্চতা পর্যন্ত বিমান চলাচল নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ২৫ হাজার ফুট উচ্চতার নিচে কোনো বিমান দেখা গেলে সেটিকে লক্ষ্যবস্তু করা হবেÑ সেই সতর্কবার্তাও দেওয়া হয়েছে নোটেমে। গত ২৬ জানুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় প্রবেশ করেছে মার্কিন বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কনসহ বেশ কয়েকটি রণতরীর বড় একটি বহর।
এই বহর আসার পরের দিনই মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক বিমান মহড়ার ঘোষণা দিল সেন্টকোম। ২০১৬ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রথম মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর ইরানের পরমাণু প্রকল্প নিয়ে ওয়াশিংটনের সঙ্গে তিক্ততা শুরু হয় তেহরানের। পরে দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর এই শত্রুতা আরও গভীর হয়। তেহরানের পরমাণু প্রকল্প ঘিরে গত বছর জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে সংঘাতও হয়েছে ইরানের। ১২ দিনের সেই সংঘাতে ইরানের পরমাণু প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলোর ব্যাপক ক্ষতি হয়, নিহত হন ইরানের বেশ কয়েকজন শীর্ষ সামরিক কমান্ডার এবং পরমাণু বিজ্ঞানী।
সংঘাত শেষে যুদ্ধবিরতি হলেও ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার উত্তেজনা হ্রাস পায়নি, উপরন্তু ইরানের সাম্প্রতিক সরকারবিরোধী বিক্ষোভ সেই উত্তেজনাকে ফের উসকে দিয়েছে। গত ডিসেম্বরের শেষ থেকে চলতি জানুয়ারির মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত চলেছে এই বিক্ষোভ। বিক্ষোভের সময়েই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যে কোনো সময়ে ইরানে সামরিক অভিযান চালানোর হুমকি দিয়েছিলেন। ট্রাম্পের নির্দেশেই জানুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে এশিয়া-প্রশান্ত অঞ্চল থেকে রওনা হয়ে ২৬ জানুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় পৌঁছায় মার্কিন বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কনসহ বেশ কয়েকটি রণতরীর একটি বহর। এই বহর আসার পরের দিন ২৭ জানুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক বিমান মহড়ার ঘোষণা দেয় মার্কিন সামরিক বাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ড (সেন্টকোম)।
এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে নিজেদের আকাশসীমা বন্ধ এবং হরমুজ প্রণালিতে লাইভ ফায়ার মহড়ার ঘোষণা দেয় ইরান। মার্কিন সামরিক বাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ড (সেন্টকোম) বিবৃতিতে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে আগামী বেশ কিছুদিন মার্কিন বিমানবাহিনীর নাইন্থ এয়ারফোর্সের মহড়া হবে। মার্কিন বিমানবাহিনীর নাইন্থ এয়ারফোর্স এয়ার ফোর্সেস সেন্ট্রাল বা এফসেন্ট নামেও পরিচিত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এ বিষয়ক বিবৃতিটি পোস্ট করেছে সেন্টকোম। সেখানে বলা হয়েছে, এই মহড়ায় মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় কমান্ডের (সেন্টকোম) আওতাভুক্ত এলাকায় শক্তি মোতায়েন, শত্রু বিমানবাহিনীকে ছত্রভঙ্গ এবং যুদ্ধ পরিস্থিতিতে নিজেকে টিকিয়ে রাখার ক্ষমতা প্রদর্শন করবে এফসেন্ট। বেশ কিছুদিন এই মহড়া চলবে।
সংবাদমাধ্যম দ্য নিউ আরব জানিয়েছে, ইরানি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সম্প্রচারিত ফুটেজে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) নৌবাহিনীর কমান্ডার আলিরেজা তাংসিরিকে সাবমেরিন ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনার ভেতরে দেখা যায়। সেখানে উৎক্ষেপণের জন্য প্রস্তুত সারিবদ্ধ রকেট দেখানো হয়। আলিরেজা বলেন, আইআরজিসি নৌবাহিনীর কাছে সমুদ্রের নিচে বিস্তৃত ক্ষেপণাস্ত্র টানেলের একটি নেটওয়ার্ক আছে, যা পারস্য উপসাগর ও ওমান সাগরে অবস্থানরত মার্কিন জাহাজকে মোকাবিলার জন্য তৈরি করা হয়েছে। তিনি জানান, এসব টানেলে এক হাজার কিলোমিটারেরও বেশি (প্রায় ৬২১ মাইল) পাল্লার শত শত ক্রুজ মিসাইল রয়েছে।
আইআরজিসি নৌবাহিনীর কমান্ডার বলেন, তাদের তৈরি কাদের ৩৮০ এল ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা এক হাজার কিলোমিটারের বেশি এবং এতে স্মার্ট গাইডেন্স ব্যবস্থা রয়েছে, যা আঘাতের মুহূর্ত পর্যন্ত লক্ষ্যবস্তুকে অনুসরণ করতে সক্ষম। ইরানি নৌবাহিনীর হরমুজ প্রণালি দিয়ে নৌপরিবহন ব্যাহত করার হুমকির মধ্যেই সমুদ্রের নিচে থাকা ক্ষেপণাস্ত্র নেটওয়ার্কের তথ্য প্রকাশ করা হলো।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন ২ কোটি ১০ লাখের বেশি ব্যারেল তেল পরিবাহিত হয়, যা বৈশ্বিক তেল পরিবহনের প্রায় ৩৭ শতাংশ। আকবরজাদেহ জোর দিয়ে বলেছেন, ইরান আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিভিন্ন পতাকাবাহী জাহাজ শনাক্ত ও অনুসরণ করতে সক্ষম। তেহরান যুদ্ধ চায় না, তবে যুদ্ধের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত। ইরান নৌবাহিনীর এই কর্মকর্তার ভাষ্য, আমাদের ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়া হলে প্রতিক্রিয়া আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে আরও কঠোর হবে।
বিশেষ করে আকাশ প্রতিরক্ষায় ইরানের প্রস্তুতি উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কার মাঝে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী জানিয়েছে, তারা যেকোনো সামরিক পরিস্থিতির জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত। আইআরজিসি মুখপাত্র বলেন, ইরানের প্রতিরোধে যুক্তরাষ্ট্র হতাশ হয়ে পড়েছে এবং এখন ইরানি সমাজকে লক্ষ্য করে মিথ্যা তথ্য ছড়ানোর মাধ্যমে উত্তেজনা বাড়ানোর চেষ্টা করছে। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হামলা নিয়ে উদ্বেগ বাড়তে থাকায় আল্লাহই যথেষ্ট শিরোনামে আট মিনিটের একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির কার্যালয়।
ভিডিওটিতে বিভিন্ন সময়ে দেওয়া খামেনির নানা ভাষণের অংশ সংকলন করা হয়েছে। সেখানে তিনি জনগণকে ভয় না পাওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, আতঙ্কিত হওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। ইরানের বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞা অনুমোদন করেছেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা। রয়টার্স জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার গৃহীত এসব নিষেধাজ্ঞা ইরানে বিক্ষোভকারীদের ওপর সহিংস দমন-পীড়নের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও সংস্থা এবং রাশিয়ার প্রতি দেশটির সমর্থনকে লক্ষ্য করে আরোপ করা হয়েছে।
এদিকে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক দুঃসাহসিকতার বিষয়ে সতর্ক করেছেন চীনের একজন কূটনীতিক। সব পক্ষকে জাতিসংঘ সনদের উদ্দেশ্য ও নীতিমালা মেনে চলার এবং অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের বিরোধিতারও আহ্বান জানান তিনি। ফিলিস্তিন ইস্যুসহ মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের এক উন্মুক্ত বিতর্কে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি বলেন, শক্তি প্রয়োগ করে সমস্যার সমাধান করা যায় না। যেকোনো ধরনের সামরিক দুঃসাহসিকতা অঞ্চলটিকে অনিশ্চয়তার অতল গহ্বরে ঠেলে দেবে।

