ডেইলি নারায়ণগঞ্জ টুয়েন্টিফোর ডটকমঃ ‘জুলাই বিপ্লবের শহীদ ও আহতদের স্মরণ করার পাশাপাশি শহীদ ওসমান হাদিকে বিশেষভাবে স্মরণের মধ্য দিয়ে ঢাকা-১৫ আসনে গণসংযোগ শুরু করেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। এ সময় তিনি বলেন, দেশের মানুষ যদি আমাদের দেশ পরিচালনার দায়িত্ব দেয়, তাহলে মিরপুরসহ ঢাকা মহানগরীকে- একটি নিরাপদ শহর হিসেবে গড়ে তুলবো; যেখানে জান, মাল ও ইজ্জতের নিরাপত্তা থাকবে। সবার জন্য উন্নয়ন নিশ্চিত করে একটি ইনসাফের বাংলাদেশ গড়ে তোলা হবে। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা হবে।
যানজটের অভিশাপ থেকে ঢাকাবাসীকে মুক্ত করা হবে। শিশু পার্ক, খেলার মাঠ ও সবুজায়ন নিশ্চিত করা হবে। একটি আধুনিক ও বাসযোগ্য রাজধানী তৈরি করা আমাদের প্রত্যয়। আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে সৎ, যোগ্য ও দক্ষ হিসেবে গড়ে তোলা হবে। সকল ধর্মের মানুষ নিরাপদ থাকবে। ব্যবসায়ীরা নিশ্চিন্তে ব্যবসা করতে পারবেন- এমন পরিবেশ তৈরি করা হবে। আধিপত্যবাদ মোকাবিলায় বাংলাদেশের মানুষ ঐক্যবদ্ধ আছে এবং থাকবে। বুধবার সকালে নিজরে নির্বাচনী আসনে গণসংযোগ কালে তিনি আরও বলেন, আজ আপনাদের সামনে দাঁড়িয়ে আমি গভীর দায়িত্ববোধ অনুভব করছি। কারণ মিরপুর শুধু ঢাকার একটি এলাকা নয়-মিরপুর হলো সংগ্রামের প্রতীক, সাহসের প্রতীক, প্রতিবাদের প্রতীক। এই মিরপুর জুলাই বিপ্লবের অন্যতম দুর্গ ছিল।
কিন্তু দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, এই মিরপুরই আজ অবহেলা, দখলদারি, যানজট, জলাবদ্ধতা, অপরাধ আর অনিরাপদ স্থানে পরিণত হয়েছে। আপনারা ঢাকার বুকে বসবাস করেন, অথচ বিশুদ্ধ পানির জন্য হাহাকার করেন। একটু বৃষ্টি হলেই কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, পল্লবী, কাফরুল- সব জায়গায় হাঁটু পানি। রাস্তাঘাট চলাচলের অযোগ্য হয়ে যায়। ড্রেন পরিষ্কার নেই, খাল দখল হয়ে গেছে। যানজট আজ আমাদের নিত্যদিনের সমস্যা। বাস আছে, কিন্তু শৃঙ্খলা নেই। ফুটপাত দখল হয়ে গেছে, মানুষ বাধ্য হয়ে রাস্তায় নামছে। এটি পরিকল্পিত অব্যবস্থাপনার ফল। আপনারা আমাদের দায়িত্ব দিলে—সঠিক ব্যবস্থাপনা ফিরিয়ে আনা হবে।বাস রুট ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা হবে।
ঢাকায় মেট্রোরেলের পরিসর আরও বাড়ানো হবে। ফুটপাত দখলমুক্ত করা হবে। মনে রাখবেন, যাদের চাঁদা তোলার মানসিকতা রয়েছে, তারা ফুটপাত দখলমুক্ত করতে চাইবে না। জামায়াতে ইসলামীকে আল্লাহ এই অভিশাপ থেকে মুক্ত রেখেছেন। স্থানীয় রাস্তাগুলোর পরিকল্পিত ও টেকসই সংস্কার করা হবে। জাতীয় যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের মাধ্যমে মিরপুরকে ঢাকার সঙ্গে কার্যকরভাবে যুক্ত করা হবে।
তিনি বলেন, ঢাকায় নারীদের নিরাপত্তা আজ সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা। মা-বোনেরা চলাচলে নিরাপদ বোধ করেন না। ছিনতাই, মাদক, কিশোর গ্যাং- সব মিলিয়ে আতঙ্কের পরিবেশ। আমরা নারীদের জন্য একটি নিরাপদ বাংলাদেশ গড়বো, ইনশাআল্লাহ। ঘর থেকে শুরু করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মস্থল, রাস্তাঘাট ও গণপরিবহন-সব জায়গায় নারীরা নিরাপদ থাকবে, ইনশাআল্লাহ। সকল ধর্মের মানুষ নিরাপদ থাকবে। প্রতিটি ওয়ার্ডে পর্যাপ্ত স্ট্রিট লাইট, গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সিসিটিভি, শক্তিশালী কমিউনিটি পুলিশিং, মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি, মাদককে আর ‘সহ্য’করা হবে না-প্রতিরোধ করা হবে। মিরপুর-কাফরুল এলাকায় বাড়িভাড়া ও আবাসন সংকট প্রকট।
মধ্যবিত্ত পরিবার চাপে, নি¤œবিত্ত মানুষ অনিশ্চয়তায়। আগুন লাগলে সব শেষ হয়ে যায়। আমরা উচ্ছেদে বিশ্বাস করি না। আমরা বিশ্বাস করি নিরাপদ ও মানবিক বস্তি উন্নয়ন এবং সাশ্রয়ী আবাসনের পরিকল্পিত উদ্যোগে। আরেকটি বড় সমস্যা-রাস্তায় ময়লার স্তূপ, দুর্গন্ধে চলা দায়। আমরা এসবের সমাধান করব।
তিনি আরও বলেন, চাঁদাবাজি ও সিন্ডিকেট করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে দ্রব্যমূল্যের দাম বাড়ানো-এই রাজনীতি আমরা বন্ধ করব। ব্যবসায়ীদের ঘাড়ে চাঁদার বোঝা চাপিয়ে যারা জনগণের পকেট কাটে, তাদের আর ছাড় দেওয়া হবে না। নিয়মিত বাজার মনিটরিংয়ের মাধ্যমে নিত্যপণ্যের দাম সহনীয় রাখা হবে। কৃষক তার পণ্যের ন্যায্য মূল্য পাবে, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করা হবে। পুরোনো দিনের বস্তাপচা রাজনীতি, পেশিশক্তির রাজনীতি ও সহিংসতার রাজনীতি বন্ধ করে আমরা দাঁড়াতে চাই গণমানুষের কল্যাণের রাজনীতির পক্ষে।
রাষ্ট্র পরিচালনায় দলীয় বিবেচনায় নয়—দেশপ্রেমিক, যোগ্য ও দক্ষ মানুষ দায়িত্ব পাবে। এই মিরপুর জুলাইয়ের দিনে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দুর্গ হয়ে উঠেছিল। এই এলাকার মানুষ অন্যায় সহ্য করে না—ইতিহাস তার সাক্ষী। আজ আবার সময় এসেছে সিদ্ধান্ত নেওয়ার। আপনাদের সম্মান, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যতের জন্য দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ভোট দিয়ে জামায়াতে ইসলামীকে সুযোগ দিন।
একই দিন ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য আয়োজিত মহিলা সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে জামায়াত আমির বলেন, ভোটের প্রচারের সময় মা-বোনদের ওপর হামলার প্রতিবাদ জানিয়ে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, যারা মায়ের গায়ে হাত তুলেছ, তারা ক্ষমা চাও, তওবা কর। ভবিষ্যতে এ ধরনের অপকর্মের চিন্তাও করবে না। মায়ের গায়ে কেউ হাত দিলে আল্লাহর আরশ কেপে যাবে। ভাইদের পাশাপাশি মা-বোনরাও ভোটের প্রচারে যাবেন- এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু কিছু জায়গায় মায়েদের গায়ে হাত তুলে থামিয়ে দেওয়া হচ্ছে, হেনস্থা করা হচ্ছে। এভাবে চোখ রাঙিয়ে তাদের থামিয়ে দেওয়া যাবে না। তারা তাদের দায়িত্ব পালন করেই যাবে।
তিনি বলেন, আর যদি কেউ মায়েদের গায়ে হাত বাড়ানোর চেষ্টা করে, তাহলে আমরা গালে হাত দিয়ে বসে থাকবো না। আমরা গর্জে উঠব। যে কোনো মূল্যে মায়েদের মর্যাদা রক্ষা করবো। আমরা একমাত্র আল্লাহ ছাড়া কোন অপশক্তির কাছে মাথা নত করবো না।
ঢাকা-১৫ আসনের প্রার্থী ডা. শফিকুর রহমান বলেন, নারী জাতিকে মায়ের জাতি হিসেবে দেখতে হবে। তাহলে প্রত্যেকটি ঘর হবে জান্নাতি ঘর, দেশ হবে সভ্য। আমরা চাই সমাজকে মায়ের স্নেহের আদর ভালবাসায় গড়ে তুলতে। এর কোনো বিকল্প নেই। আমরা মায়েদের সম্মানের জায়গায় রাখতে চাই। তাদের সম্মান ও মর্যাদা যে কোনো মূল্যে নিশ্চিত করবো। মেয়েদের জন্য নিরাপদ যানবাহন নিশ্চিত করা হবে। তাদের কর্মক্ষেত্রে বেবি কর্নার, বেস্ট ফিডিং, ডে কেয়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে।
জামায়াত আমির বলেন, আমরা বলেছিলাম-মায়েদের জন্য কর্মঘণ্টা ৫ ঘণ্টা করব। কিছু না বুঝেই অনেকে চিৎকার শুরু করে দিল। অথচ অনেক মা সন্তানের জন্য চাকরিই ছেড়ে দেয়। তাদের জন্য কর্মঘণ্টা ৫ ঘণ্টা করা হলে এবং বেবি কেয়ার ব্যবস্থা থাকলে সেখানে তাদের চাকরি ছাড়তে হবে না।
তিনি বলেন, মায়েরাই রাষ্ট্রের বুনিয়াদ। তাদের বাদ দিয়ে কোন উন্নয়ন চিন্তাই করা যাবে না। অথচ তাদের পুরুষের সমান কর্মঘণ্টা অবিচার নয়? আমরা সুবিচার কায়েম করব। কেউ ৮ ঘণ্টাই করলে ওয়েলকাম করব। এই সুযোগ শুধু মুসলমানদের জন্য নয়। সব ধর্মের মায়েদের জন্যই থাকবে। এছাড়া নারীদের জরুরি প্রয়োজনের জন্য মার্কেটে পর্যাপ্ত ওয়াশরুম, নামাজের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে। নারী-পুরুষ উভয়ের সমন্বয়েই আমরা মানবিক সমাজ চাই। আল্লাহ যে প্রাকৃতিক নিয়ামত দিয়েছেন তাকে মেনে নিয়েই এসব কাজ করতে চাই।
জামায়াত আমির বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারি দুটি ভোট আছে। এরমধ্যে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, হ্যাঁ মানে বাংলাদেশ জিতে যাওয়া, হ্যাঁ মানে আজাদী, হ্যাঁ জেতা মানে ফ্যাসিবাদ ফিরে না আসা। ন্যায় ও ইনসাফের পক্ষে হ্যাঁ বিজয়ী করতে হবে। একইসঙ্গে বেশি অতীতে যাওয়ার প্রয়োজন নেই, চব্বিশের বিপ্লবের পর কার আচার-আচরণ, কার চলাফেরা কেমন তা পরিষ্কার হয়ে গেছে। যাদের ওপর আস্থা রাখতে পারবো। যারা আমানত রক্ষা করতে পারবে। তাদের পক্ষে আমরা ভোট দেব।
তিনি বলেন, ১২ তারিখের বিজয় জামায়াতের না হয়ে ১৮ কোটি মানুষের বিজয় যেন হয়। তাহলে জামায়াতের বিজয় হবে। আমরা সত্যিকার মানবতার বিজয় চাচ্ছি। কোনো ধর্ম-বর্ণ দেখবনো না। আশরাফুল মাখলুকাত মানুষ হিসেবেই সবাইকে দেখবো। আগামী দিনের বাংলাদেশ হবে মা বোনদের ইজ্জতের বাংলাদেশ। স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষার বাংলাদেশ। ন্যায়-ইনসাফের বাংলাদেশ।
ঢাকা মহানগর উত্তর জামায়াতের নায়েবে আমির ও ঢাকা-১৫ আসন পরিচালক আব্দুর রহমান মুসার সভাপতিত্বে সমাবেশে আরো বক্তব্য দেন দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য মোবারক হোসাইন, শিবিরের সাবেক সভাপতি জাহিদুল ইসলামসহ জামায়াতের মহিলা বিভাগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা।

