ডেইলি নারায়ণগঞ্জ টুয়েন্টিফোর ডটকমঃ দুপুরে ঢাকার সড়কে উত্তপ্ত অবস্থা। মাথার ওপর সূর্য। যার কিরণের তেজও বেশ। সন্ধ্যার পর বাংলামোটর এলাকা। বোঝার উপায় নেই যে এটি শীতের চূড়ান্ত সময়। কিন্তু ২ কিমি এগিয়ে গেলে সংসদ ভবন এলাকায় শীতের অনুভূতি হয় বেশ। মনে হয় যেন শহর ছেড়ে গ্রামে চলে এসেছি। জানুয়ারি মাসকে বলা হয় বাংলাদেশের শীতলতম মাস। নতুন বছরের এই সময়ে দাঁড়িয়ে দেশের অধিকাংশ জেলাসহ ঢাকার আবহাওয়া যেন ভিন্ন এক রূপ ধারণ করেছে।
ক্যালেন্ডারের পাতায় মাঘ মাস। কিন্তু শীতের সেই চিরচেনা আমেজ নেই। দেশের গড় বৃষ্টিপাতের একটি অংশ শীতকালে হয়। কিন্তু এবার বৃষ্টিপাতের পরিমাণও শূন্য। যে কারণে বেড়েছে গড় তাপমাত্রা। আবহাওয়াবিদরা এই অবস্থাকে জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম কারণ বলে আখ্যা দিয়েছেন। ফলে শীতের পরিবর্তে গরমের অনুভূতিতে দিন কাটছে নগরবাসীর।
আবহাওয়া অধিদপ্তর এরমধ্যেই আগামী দুইদিন তাপমাত্র কমে আসার খবর দিচ্ছে। আবহাওয়াবিদরা জানান, বুধবার ও বৃহস্পতিবার সারাদেশের তাপমাত্রা কিছুটা কমে আসবে। তবে শুক্রবার থেকে তাপমাত্রা আবারও বাড়তে শুরু করবে। এরপর আবারও তাপমাত্রার নি¤œমুখী হওয়ার সম্ভবনা রয়েছে। সেসময় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শৈত্যপ্রবাহ ছড়িয়ে পড়তে পারে।
ঢাকায় বসবাস করা ব্যক্তিরা জানান, জানুয়ারি মাস মানেই এক সময় ছিল হাড়কাঁপানো শীত, ঘন কুয়াশা আর লেপ-কাঁথা মুড়ি দিয়ে রাত্রিযাপন। কিন্তু বর্তমানে ঢাকার চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। শীতলতম মাস হওয়া সত্ত্বেও মেগাসিটি ঢাকার বাসিন্দারা শীতের বদলে বরং ভ্যাপসা গরম আর অস্বস্তিকর আবহাওয়ার মুখোমুখি হচ্ছেন। যদিও আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য এবং পরিবেশবিদদের বিশ্লেষণ বলছে, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদী জলবায়ু পরিবর্তন ও অপরিকল্পিত নগরায়নের এক ভয়াবহ ফল।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ আবুল কালাম মল্লিক জনকণ্ঠকে বলেন, শীতলতম মাসে শীত না পড়ার বেশকিছু কারণ রয়েছে। বায়ুম-লের ঘূর্ণন প্রক্রিয়া পরিবর্তন হয়েছে। যা জলবায়ু পরিবর্তনের দৃশ্যমান কারণ। ঊর্ধ্ব আকাশে উচ্চচাপ বলয়ের কারণে বাতাস নিচে নেমে আসে। ঊর্ধ্বমুখী আকাশের বাতাস নি¤œমুখী বিচরণ হয়। এবার সেটিও নেই। বৃষ্টিপাত শূন্য। আবার দিনের বেলায় সূর্যের বিকিরণও যথেষ্ট। ডিসেম্বর- জানুয়ারিতে পশ্চিমা লঘুচাপ তৈরি হয়। এবার সেটিও হয়নি। বাংলাদেশে উত্তরা বাতাসের প্রাধান্য বিস্তার করতে পারেনি।
ফলে শীতের অনুভূতিও বোঝা যাচ্ছে না। তিনি বলেন, অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে এ মাসে দিনের তাপমাত্রা ১-৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি রয়েছে। আবহাওয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, এ বছরের জানুয়ারির শেষ সময় এসেও ঢাকার দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে ২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ঘোরাফেরা করছে। অথচ এই সময়ে গড় তাপমাত্রা ১৯ ডিগ্রি থেকে ২২ ডিগ্রি থাকে। যদিও রাতের সর্বনি¤œ তাপমাত্রা ১৩ ডিগ্রি থেকে ১৭ ডিগ্রির মধ্যে থাকছে। কিন্তু দিনের প্রখর রোদ ও গরম বাতাস সেই শীতল অনুভূতিকে পুরোপুরি মুছে দিচ্ছে।
এর জন্য আরও কিছু বিষয়কে দায়ী করছেন পরিবেশবিদ ও আবহাওয়াবিদরা। এরমধ্যে আর্বান হিট আইল্যান্ড ইফেক্ট অন্যতম। তারা জানান, ঢাকা শহর এখন মূলত লোহা আর কংক্রিটের স্তূপ। বহুতল ভবন এবং পিচ ঢালা রাস্তা দিনের বেলা সূর্যের তাপ শোষণ করে নেয়। গাছপালা ও জলাশয় কমে যাওয়ায় এই তাপ বিকিরিত হতে পারে না, ফলে শহরের তাপমাত্রা পার্শ্ববর্তী গ্রামীণ এলাকার তুলনায় ৩-৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি থাকছে। এছাড়াও উত্তর-পশ্চিমী বায়ুর বাধা বাংলাদেশে শীত আসে হিমালয় থেকে আসা হিমেল বাতাসের হাত ধরে।
এ বছর বায়ুম-লের ওপরের স্তরে জেট স্ট্রিম বা পশ্চিমা লঘুচাপের প্রবাহ এমনভাবে অবস্থান করছে যে, শীতল বাতাস উত্তরবঙ্গ পার হয়ে ঢাকায় পৌঁছানোর আগেই দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। প্রশান্ত মহাসাগরের এল নিনো প্রবাহের কারণে বিশ্বজুড়েই তাপমাত্রার রেকর্ড ভাঙছে। এর প্রভাবে শীতকালীন মৌসুমি বায়ু তার স্বাভাবিক শক্তি হারিয়েছে। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবে গত এক দশকে বাংলাদেশের শীতের স্থায়িত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ঢাকায় যানবাহনের সংখ্যা ও এসির ব্যবহার এতটাই বেড়েছে যে, এ থেকে নির্গত কার্বন ও গরম বাতাস স্থানীয় তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখছে।
শীতের এই অনুপস্থিতি শুধু অস্বস্তিই বাড়াচ্ছে না, বরং এটি পরিবেশগত ভারসাম্যের জন্য হুমকিস্বরূপ। সঠিক সময়ে শীত না পড়ায় শীতকালীন ফসলের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। পাশাপাশি, হুটহাট তাপমাত্রার এই ওঠানামা সাধারণ মানুষের মধ্যে সর্দি-কাশি ও জ্বরের মতো মৌসুমি রোগের প্রকোপ বাড়িয়ে দিয়েছে। পরিবেশবিদদের মতে, যদি ঢাকার সবুজায়ন এবং জলাশয় রক্ষা করা না যায়, তবে অদূর ভবিষ্যতে ঢাকা থেকে শীতকাল পুরোপুরি হারিয়ে যেতে পারে। জানুয়ারি মাসও তখন বসন্ত বা গ্রীষ্মের মতো উষ্ণ হয়ে উঠবে। ঢাকার এই পরিবর্তন আমাদের প্রকৃতির সতর্কবার্তা দিচ্ছে। শীতলতম মাসে শীতের এই অনুপস্থিতি কেবল একটি ঋতু পরিবর্তনের খবর নয়, বরং আমাদের বসবাসের পরিবেশ কতটা সংকটাপন্ন, তারই এক প্রামাণ্য দলিল।
জানুয়ারি মাসে দেশে গড় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ৯ মিমি। এবার ১ মিমি বৃষ্টির দেখা পাওয়া যায়নি। রাজধানী ঢাকায় ৭ দশমিক ৫ মিমি বৃষ্টি হওয়ার কথা। রাজশাহীতে এসময় বৃষ্টি হয় ১২ মিমি। যশোর ও চুয়াডাঙ্গায় ১৪ দশমিক ৮ মিমি বৃষ্টিপাত হয়। আবহাওয়াবিদ আবুল কালাম মল্লিক বলেন, বৃষ্টিপাত ভূপৃষ্ঠকে শীতল করে। এতে ঠান্ডা বেশি অনুভূত হয়। কিন্তু এবার কোনো বৃষ্টিপাত ঘটেনি। যা তাপমাত্রা কমাতে বাধাগ্রস্ত করেছে।

