ডেইলি নারায়ণগঞ্জ টুয়েন্টিফোর ডটকমঃ স্বাভাবিক সময়েই যানজটে নাকাল থাকে নারায়ণগঞ্জ নগরী। এর মধ্যে চলছে ড্রেনের কাজ। ফলে শহর যেন স্থবির হয়ে থাকছে। প্রতিনিয়ত শহরে বাড়ছে মানুষ, বাড়ছে যানবাহন, যানজট। সমস্যা সমাধানে নগরীর দুই নম্বর রেলগেট থেকে চাষাঢ়া পর্যন্ত বাইপাস রাস্তা নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে প্রশাসন।
তবে এ রাস্তার চিন্তা নতুন নয়। ২০০৭ সালে এ উদ্যোগ নিয়েছিলেন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সে সময়ের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী। কাজও হয়েছিল অনেকটা। কিন্তু রেলওয়ের বাধা ও মামলার কারণে আটকে যায় এই রাস্তার কাজ। অভিযোগ রয়েছে এর পেছনে ছিলেন সে সময়ের আওয়ামী লীগের এমপি শামীম ওসমান। ১৯ বছর পরে নগরীর যানজট নিরসনে আইভীর দেখানো পথেই হাঁটছে প্রশাসন।
নারায়ণগঞ্জ শহরের এক নম্বর রেলগেট এলাকায় অবস্থিত একটি বেসরকারি ব্যাংকে চাকরি করেন শাহ্ জামান রানা। শুক্রবার ছুটির দিনে নগরীর দ্বিগু বাবার বাজার থেকে সাপ্তাহিক বাজার করে ফিরছিলেন। তাঁর বাড়ি নগরীর আল্লামা ইকবাল রোডে। কিন্তু বাজারের নারায়ণগঞ্জ ক্লাব প্রান্তে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকেও রিকশা পাচ্ছিলেন না। রানা বললেন, খালি রিকশা এ পর্যন্ত আসতে পারছে না যানজটের কারণে। আজ শুক্রবার যানজট থাকার কথা নয়। কিন্তু যানজট বেশ ভালোই আছে। সিটি করপোরেশন ড্রেনের কাজ করছে। এ জন্য নগরী স্থবির হয়ে থাকছে প্রতিদিন।
একই অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে স্কুল শিক্ষক আল আমিন বলেন, যানজট কমানোর কথা বলে নগরীর মর্গ্যান বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে, বালুর মাঠে মডার্নের সামনে, পপুলারের সামনে রাস্তা বন্ধ করে দিয়েছে প্রশাসন। বাধ্য হয়ে সব যানবাহনকে দুই নম্বর রেলগেট, গলাচিপা মোড় অথবা চাষাঢ়া মোড়ে যেতে হচ্ছে। মানুষের ভোগান্তির পাশাপাশি রিকশা ভাড়াও বেড়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে, কেউ বাজার করলে বা কোনো ভারী কিছু নিলে ভোগান্তির শেষ থাকে না। এজন্য শহরে বিকল্প একটা রাস্তা প্রয়োজন।
নগরবাসীর ভোগান্তি নিরসনে ২০০৭ সালে সেলিনা হায়াৎ আইভী দুই নম্বর রেলগেট থেকে চাষাঢ়ার মহিলা কলেজ পয়েন্ট পর্যন্ত একটি রাস্তা নির্মাণের উদ্যোগ নেন। নারায়ণগঞ্জ নাগরিক আন্দোলনের আহ্বায়ক রফিউর রাব্বি এ প্রসঙ্গে বলেন, ২০০৭-০৮ সালে আইভী এ রাস্তা নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। এ রাস্তার জমি অবৈধ দখলে ছিল। ৬০ ভাগ অংশ আরসিসি ঢালাই করা রাস্তা নির্মাণও করেন। কিন্তু নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সাবেক এমপি শামীম ওসমান রেলওয়েকে দিয়ে মামলা করিয়ে রাস্তা নির্মাণ বন্ধ করে দেন।
তবে নারায়ণগঞ্জ শহরের যানজট নিরসনে এই রাস্তার দাবি বিভিন্ন সময়ে উঠতে থাকে। গত ২৭ অক্টোবর নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত রেলসেবার উন্নয়নবিষয়ক মতবিনিময় সভায় রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব ও রেলওয়ের মহাপরিচালকসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এলে নারায়ণগঞ্জ নাগরিক আন্দোলন, নারায়ণগঞ্জ নাগরিক কমিটিসহ শহরের নাগরিক নেতারা এ রাস্তার দাবি আবার তোলেন।
গুরুত্ব বুঝতে পেরে রাস্তাটি বাস্তবায়নে আবার উদ্যোগ নিয়েছেন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবু নসর মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ। তিনি গত ডিসেম্বরে এটি নির্মাণে অনুমতি চেয়ে রেল মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেন। সম্প্রতি নাগরিক আন্দোলন এ রাস্তা নির্মাণের জন্য জেলা প্রশাসক ও সিটি করপোরেশনের কাছে আবার দাবি জানায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ১৩ জানুয়ারি জেলা প্রশাসক রায়হান কবিরের সভাপতিত্বে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে একটি সভা হয়। সভায় রেজু্লেশন গ্রহণের মাধ্যমে রেল মন্ত্রণালয়ের কাছে ক্লিয়ারেন্স চেয়ে চিঠি পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়। অনুমোদন পাওয়া গেলে খুব দ্রুতই বাইপাস সড়কের নির্মাণকাজ শুরু হবে বলে জানান ওই সভায় উপস্থিত নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সিনিয়র সহসভাপতি মোরশেদ সারোয়ার সোহেল। তিনি বলেন, এই বাইপাস সড়ক হলে শহরের যানজট অনেকটাই কমে যাবে।
নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের টাউন প্ল্যানার মঈনুল ইসলাম বলেন, আমরা বেশ কিছু অংশ রাস্তা তৈরিও করি। তবে চাষাঢ়ার মুখ পর্যন্ত যেতে পারিনি। রেলওয়ে তাদের ডাবল লাইন করার কারণ দেখিয়ে এতে বাধা দেয় এবং আমাদের বিরুদ্ধে মামলা করে। মামলা এখনও চলছে। তিনি বলেন, ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রেললাইনের এই অংশে গ্রাউন্ড লেভেলে ডাবল লাইন করে ৬৪ জোড়া ট্রেন চালানোর যে পরিকল্পনা তারা করেছিল, তা বাস্তবসম্মত নয়। চাষাঢ়া থেকে এক নম্বর রেলগেট পর্যন্ত রেলওয়ের তিনটি অথরাইজড রেলগেট এবং তিনটি নন-অথরাইজড রেলগেট রয়েছে। ৬৪ জোড়া ট্রেনের জন্য যদি ৫ মিনিট করে এসব গেট বন্ধ থাকবে বলে ধরা হয়, তাহলে ১০ ঘণ্টা ৬ মিনিট এসব গেট বন্ধ থাকবে। ফলে শহর পুরোই অচল হয়ে পড়বে। তাই আমরা রেলওয়েকে চাষাঢ়া থেকে ট্রেনকে ওভারপাস বা আন্ডারপাস করে নারায়ণগঞ্জ রেলস্টেশনে নিতে প্রস্তাব দিয়েছি। আর দুই নম্বর রেলগেট থেকে চাষাঢ়া পর্যন্ত রেলওয়ের ভূমি রাস্তা নির্মাণের জন্য দিতে অনুরোধ জানিয়েছি। রেলওয়ের অনুমতি পেলে সিটি করপোরেশন বাকি কাজ সম্পন্ন করবে।
নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক রায়হান কবির জানান, নাগরিক নেতাদের দাবি ও সিটি করপোরেশনের চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে আমরা বিষয়টি লিখিতভাবে রেলওয়ের সচিবকে জানিয়েছি। তারা রেলওয়ের জায়গা ব্যবহারের অনুমতি দিলে রাস্তার মুখ খুলে দেওয়া হবে। রেলওয়ে মন্ত্রণালয়ের সচিব ফাহিমুল ইসলাম জানান, আমরা চিঠি পেয়েছি। এর আগে নারায়ণগঞ্জে একটি সভায় গেলে সবার দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি খোঁজখবর নিয়ে দেখেছি, এখানে রাস্তার অনুমতি দেওয়া সম্ভব। আমরা এ ব্যাপারে আলোচনা করে অচিরেই নারায়ণগঞ্জের প্রশাসনকে জানিয়ে দেব।

