ডেইলি নারায়ণগঞ্জ টুয়েন্টিফোর ডটকমঃ নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার থানা থেকে লুট হওয়া সব অস্ত্র গত দেড় বছরেও উদ্ধার করা যায়নি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে এসব অস্ত্র নিয়ে উদ্বেগে রয়েছেন নারায়ণগঞ্জ-২ (আড়াইহাজার) আসনের প্রার্থীরা।
থানা থেকে ৫০টি অস্ত্র ও বিপুল পরিমাণ গুলি লুট হলেও এ পর্যন্ত ৩৩টি অস্ত্র উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। বাকি ১৭টির হদিস নেই। এর মধ্যে গত ৯ জানুয়ারি উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক প্রভাবশালী এক নেতার বাড়ি থেকে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে যৌথবাহিনীর অভিযানে থানা লুটের একটি পিস্তল ও গোলাবারুদ উদ্ধার হয়। ওইদিন বিপুলসংখ্যক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রায় পাঁচ ঘণ্টার অভিযানে এই অস্ত্রটি ও কয়েক রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়। তবে অস্ত্র লুট বা রাখার সঙ্গে জড়িত কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি।
আড়াইহাজার উপজেলার সন্ত্রাসের জনপদ হিসেবে কুখ্যাতি পাওয়া কালাপাহাড়িয়া ইউনিয়নসহ বিভিন্ন স্থানে সম্প্রতি বেশ কয়েকটি রক্তক্ষয়ী সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া বিভিন্ন সড়কে নিয়মিত ছিনতাই হচ্ছে। এসব ঘটনায় দেশি অস্ত্রের পাশাপাশি আগ্নেয়াস্ত্রও ব্যবহার হয়েছে। যথেচ্ছ অস্ত্রের ব্যবহারে অভ্যস্ততার কারণে নির্বাচনের প্রচার চলাকালে এ অঞ্চলের অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা যে কারও জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন প্রার্থীদের অনেকে। নিজেদের পাশাপাশি কর্মীদের নিরাপত্তা নিয়েও তারা উদ্বিগ্ন।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বিকেলে আড়াইহাজার থানায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার ছাত্র-জনতা হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। তাদের ভয়ে পুলিশ সদস্যরা থানা ছেড়ে পালিয়ে গেলে যে যেভাবে পেরেছে ভাঙচুর লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করে অস্ত্র ও মালপত্র লুট করে নিয়ে যায়। পরবর্তীতে দায়ের করা মামলায় বলা হয়, থানা ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগে ৪৯ কোটি ৫৫ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।
লুটপাটের পর ওই বছরের ১৬ আগস্ট আড়াইহাজার থানার ওসির নাম ও মোবাইল ফোন নম্বর দিয়ে মাইকিং ও বিভিন্ন যোগাযোগ মাধ্যমে এলান করে লুণ্ঠনকৃত অস্ত্র, গুলি ও অন্যান্য মালপত্র তিন দিনের মধ্যে নিজ নিজ এলাকার মসজিদের ইমাম বা গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের কাছে জমা দেওয়ার জন্য অনুরোধ জানানো হয়। কিন্তু লুণ্ঠিত মালপত্র ফেরত পাওয়া যায়নি। এরপর গত দেড় বছরে সেসব অস্ত্র উদ্ধার করাও সম্ভব হয়নি।
এখনও উদ্ধার না হওয়া অস্ত্রের তালিকায় রয়েছে চায়না রাইফেল দুটি, চায়না সাব-মেশিনগান (এসএমজি) একটি, ১২ বোর শটগান ৭টি, চায়না পিস্তল একটি, ৯ মিমি পিস্তল দুটি এবং গ্যাস গান ৪টি। এ ছাড়া বিপুল পরিমাণ গুলিও লুট করা হয়।
এর মধ্যে পরিত্যক্ত অবস্থায় গত বছরের ৩ অক্টোবর ১২০টি কাঁদানে গ্যাসের শেল ও ৩০টি সাউন্ড গ্রেনেড, ৫ অক্টোবর ১০৫ রাউন্ড গুলি, ৭ অক্টোবর একটি পিস্তল, একটি ম্যাগাজিন, ৮ রাউন্ড গুলি, ২৩ নভেম্বর ৭.৬২ এমএম চায়না রাইফেল ও গত ৯ জানুয়ারি কদমীচর এলাকা থেকে একটি পিস্তলসহ গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়।
পুলিশের তথ্য মতে, থানা থেকে অস্ত্র গোলাবারুদ লুট হওয়ার দেড় বছর পার হলেও সাব মেশিনগান-রাইফেলসহ ১৭টি বিভিন্ন ক্যাটেগরির অস্ত্র ও গোলাবারুদ এখনও উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। এ নিয়ে সাধারণ ভোটার ও প্রার্থীরা শঙ্কায় রয়েছেন।
থানা থেকে লুট হওয়া বিপুল পরিমাণ অস্ত্র গোলাবারুদ উদ্ধার না হওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী সাবেক সংসদ সদস্য আতাউর রহমান খান আঙ্গুর। তিনি বলেন, নির্বাচনী সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখার পূর্বশর্ত হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা। আইনশৃঙ্খলা বিঘ্ন সৃষ্টিকারী সন্ত্রাসীদের আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করে সুষ্ঠু নির্বাচনী পরিবেশ তৈরি করতে হবে। এজন্য তিনি দ্রুত থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্রসহ অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করে সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারের অনুরোধ করেন।
জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী অধ্যাপক ইলিয়াছ মোল্লা বলেন, অবৈধ অস্ত্র সন্ত্রাসীদের কাছে থাকায় বিভিন্ন স্থানে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটছে। বিশেষ করে কালাপাহাড়িয়ায় অবৈধ অস্ত্র ও গোলাবারুদ ব্যবহার করে সন্ত্রাসীরা প্রতিনিয়ত সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। কালাপাহাড়িয়াসহ আড়াইহাজারের সর্বত্র অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারের দাবি জানান তিনি।
বিএনপির প্রার্থী নজরুল ইসলাম আজাদ বলেন, সতেরো বছর ধরে জনগণ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেনি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট দেওয়ার জন্য ভোটাররা অধীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছে। তাই ভোটাররা যাতে নির্বিঘ্নে ভোট কেন্দ্রে গিয়ে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে সেই ধরনের নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করতে হবে। এজন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীকে সব ধরনের অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করার জন্য তিনি অনুরোধ করেন।
একই আসনে গণঅধিকার পরিষদের কামরুল মিয়া ও বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) মনোনীত প্রার্থী হাফিজুল ইসলাম চরাঞ্চলের কেন্দ্রগুলোতে বাড়তি নিরাপত্তার দাবি জানিয়ে বলেন, বিগত নির্বাচনে লাইসেন্সধারী অস্ত্রও জমা নেওয়া হতো, কিন্তু এবার অবৈধ অস্ত্রই উদ্ধার হয়নি।
আড়াইহাজার পৌরসভার ভোটার জাকির হোসেন মোল্লা বলেন, কোনো ভয়-ভীতি ছাড়াই যেন মানুষ তার মূল্যবান ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে, এজন্য নির্বাচন কমিশনকে ব্যবস্থা নিতে হবে। ভোটকেন্দ্রগুলো নিরাপদ করতে হবে।
জনমনে শঙ্কা থাকলেও আশ্বস্ত করছে স্থানীয় প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশন। সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা ও আড়াইহাজারের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আসাদুর রহমান জানান, অস্ত্র উদ্ধারে পুলিশ ও সেনাবাহিনী নিরলস কাজ করছে। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা রিয়াজ আহম্মেদ জানান, চরাঞ্চল ও ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে এবং সেখানে বাড়তি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন থাকবে।
আড়াইহাজার থানার ওসি মোহাম্মদ আলাউদ্দিন জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বিকেলে আড়াইহাজার থানায় দুর্বৃত্তরা হামলা ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। লুটে নেয় থানার অস্ত্র, গোলাবারুদ ও গুরুত্বপূর্ণ মালপত্র। এর মধ্যে বেশ কিছু গুলি পরিত্যক্ত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে। তবে এখনও ১৭টি অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার বাকি রয়েছে। তিনি বলেন, লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধার না হওয়ায় প্রার্থীদের শঙ্কা থাকা স্বাভাবিক। এসব অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধারে যৌথ বাহিনীর নিয়মিত অভিযান চলছে। এ ছাড়াও লুণ্ঠিত ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে একটি বিশেষ টিম গঠন করা হয়েছে।

