ডেইলি নারায়ণগঞ্জ টুয়েন্টিফোর ডটকমঃ যুক্তরাষ্ট্রের হাতে গ্রিনল্যান্ড তুলে দেওয়ার বিরোধিতা করায় আগামী ১ ফেব্রুয়ারি থেকে যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সসহ ইউরোপের ৮ দেশের পণ্য রপ্তানির ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি হুমকি দিয়েছেন, যদি আগামী জুনের মধ্যে ডেনমার্ক যুক্তরাষ্ট্রের কাছে গ্রিনল্যান্ড বিক্রি না করে, তাহলে এসব দেশকে ২৫ শতাংশ শুল্ক গুনতে হবে। এদিকে গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউরোপীয় মিত্রদের ওপর শুল্ক আরোপের হুমকি দেওয়ায় ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) নজিরবিহীন অর্থনৈতিক পাল্টা ব্যবস্থার দাবি উঠেছে।
রবিবার এই ব্লকের নেতারা ইইউর অ্যান্টি-কোয়েরশন ইনস্ট্রুমেন্ট (এসিআই) নামে পরিচিত বিশেষ ব্যবস্থা সক্রিয় করার আহ্বান জানিয়েছেন। এর আগে অতীতে কখনো এই ব্যবস্থা প্রয়োগের নজির নেই ইউরোপে। খবর বিবিসির।
রবিবার সামাজিক মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লিখেছেন, যদি জুনের মধ্যে গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের কেনার বিষয়টি পুরোপুরি সম্পন্ন শেষ না করা হয় তাহলে ১ জুন থেকে শুল্ক বেড়ে দাঁড়াবে ২৫ শতাংশে। এর একদিন আগে ট্রাম্প হুমকি দিয়েছিলেন ইউরোপের যেসব দেশ গ্রিনল্যান্ড বিক্রির ক্ষেত্রে বাধা দিচ্ছে তাদের ওপর শুল্ক আরোপ করা হবে। গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্কের একটি বিশাল স্বায়ত্ত্বশাসিত আর্কটিক অঞ্চল। বরফে ঢাকা গ্রিনল্যান্ড প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর। ট্রাম্প দাবি করে আসছেন জাতীয় নিরাপত্তার জন্য তার ডেনমার্ক প্রয়োজন। ইউরোপের দেশগুলো জানিয়েছে গ্রিনল্যান্ডের ব্যাপারে একমাত্র সিদ্ধান্ত নিতে পারে ডেনমার্ক।
দেশটি ইতোমধ্যে ইউরোপের মিত্র দেশগুলোর সেনাদের নিয়ে গ্রিনল্যান্ডে সেনা উপস্থিতি বাড়াচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্টের দপ্তর জানিয়েছে, গ্রিনল্যান্ডে ইউরোপীয়রা সেনার সংখ্যা বাড়ালেও যুক্তরাষ্ট্রের এ অঞ্চলটির নিয়ন্ত্রণ নিতে এটি কোনো প্রভাব ফেলবে না। শনিবার গ্রিনল্যান্ডে হাজার হাজার মানুষ বিক্ষোভ করেন। তারা স্লোগান দেন গ্রিনল্যান্ড বিক্রির জন্য নয় এবং আমরাই আমাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেব।
যুক্তরাষ্ট্রকে গ্রিনল্যান্ড কেনার অনুমতি না দেওয়া পর্যন্ত ডেনমার্ক, সুইডেন, ফ্রান্স, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস ও ফিনল্যান্ডসহ ইইউর কয়েকটি দেশের পাশাপাশি ব্রিটেন ও নরওয়ের ওপর ধাপে ধাপে বাড়তি শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এসব দেশ ইতোমধ্যে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ মার্কিন শুল্কের আওতায় রয়েছে। গ্রিনল্যান্ডে পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর মহড়ায় সীমিত সংখ্যক সৈন্য মোতায়েন করায় ট্রাম্প ওই শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন। ট্রাম্পের হুমকির পর ইইউর সভাপতি দেশ সাইপ্রাস ব্রাসেলসে রাষ্ট্রদূতদের জরুরি বৈঠক আহ্বান করেছে।
ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র বলেছে, তিনি সমন্বিত ইউরোপীয় প্রতিক্রিয়া গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ শুরু করেছেন এবং এসিআই সক্রিয় করার পক্ষে জোর দিচ্ছেন। এই ব্যবস্থার আওতায় ইইউতে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি টেন্ডারে প্রবেশ সীমিত কিংবা সেবা বাণিজ্যে বিধিনিষেধ আরোপ করা হতে পারে। জার্মানির সংসদের বাণিজ্যবিষয়ক কমিটির চেয়ারম্যান বের্ন্ড লাঙ্গে ও ইউরোপীয় পার্লামেন্টের রি-নিউ ইউরোপ গোষ্ঠীর প্রধান ভ্যালেরি হায়ার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেওয়া পোস্টের একই দাবির কথা জানিয়েছেন।
জার্মানির প্রকৌশল শিল্প সংগঠনও ওই ব্যবস্থা সক্রিয় করার প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। তবে ইইউর কয়েক কূটনীতিক যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এখনই উত্তেজনা বাড়ানো ঠিক হবে না বলে মন্তব্য করেছেন। ইউরোপের অন্যান্য নেতাদের তুলনায় ট্রাম্পঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি মার্কিন প্রেসিডেন্টের শুল্ক আরোপের হুমকিকে ভুল বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেছেন, কয়েক ঘণ্টা আগে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে এবং অন্যান্য ইউরোপীয় নেতাদের সঙ্গেও তিনি আলোচনা করবেন। ইতালি এখন পর্যন্ত গ্রিনল্যান্ডে কোনো সৈন্য পাঠায়নি। ব্রিটেনের সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী লিসা ন্যান্ডি বলেছেন, মিত্রদের যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাজ করেই সমাধান খুঁজতে হবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, গ্রিনল্যান্ড বিষয়ে আমাদের অবস্থান অ-আলোচনাযোগ্য এবং বাগযুদ্ধ এড়ানোই সবার উদ্দেশ্য।
ট্রাম্পের শুল্ক হুমকির ফলে গত মে মাসে যুক্তরাষ্ট্র-ব্রিটেন এবং জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্র-ইইউর মধ্যে স্বাক্ষরিত কয়েকটি সীমিত বাণিজ্য চুক্তির বিষয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এসব চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক বহাল থাকলেও অংশীদারদের আমদানি শুল্ক কমানোর কথা ছিল। ইউরোপীয় পার্লামেন্ট বর্তমানে জুলাইয়ের ইইউ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তির অনুমোদন প্রক্রিয়া স্থগিত করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আগামী ২৬-২৭ জানুয়ারি ইইউর আমদানি শুল্ক কমানোর ওপর ভোট হওয়ার কথা থাকলেও ইউরোপীয় পিপলস পার্টির নেতা মানফ্রেড ভেবার বলেছেন, আপাতত অনুমোদন সম্ভব নয়।
এদিকে এই উত্তেজনার মধ্যেই ইইউ দক্ষিণ আমেরিকার মেরকোসুর জোটের সঙ্গে তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে। ইউরোপীয় কমিশনের প্রধান উরসুলা ভন ডার লিয়েন বলেছেন, এটি বিশ্বকে শক্ত বার্তা দেয় যে আমরা শুল্ক নয়, ন্যায্য বাণিজ্য বেছে নেই; বিচ্ছিন্নতা নয়, দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব বেছে নেই।

