আড়াইহাজারে বেপরোয়া ডাকাতি,
ডেইলি নারায়ণগঞ্জ টুয়েন্টিফোর ডটকমঃ নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে সন্ধ্যা নামলেই ডাকাত আতঙ্ক বিরাজ করে। একের পর এক সংঘবদ্ধ ডাকাতির ঘটনায় ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের রাত কাটে চরম উৎকণ্ঠায়। প্রায় প্রতিরাতেই কোনো না কোনো এলাকায় সশস্ত্র ডাকাত দল বাড়িতে হানা দিয়ে লুটপাট করছে। তাদের হামলায় আহত হচ্ছে নারী-শিশুসহ অনেকে। ডাকাতের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে স্থানীয়রা সম্প্রতি জুমার নামাজের পর বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে। তাদের অভিযোগ, পুলিশের নিষ্ক্রিতায় ডাকাতরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।
সবশেষ শুক্রবার রাতে এক মৎস্য ব্যবসায়ীর বাড়িতে ডাকাতির ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। তবে পুলিশ বলছে, ডাকাতদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। অনেক ডাকাতকে গ্রেফতারও করা হয়েছে। র্যাব, পুলিশ ও সেনাবাহিনী ডাকাতদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় নিয়ে আসতে কাজ করছে।
ভুক্তভোগী মৎস্য ব্যবসায়ী হাজী সিরাজ মিয়া জানান, তার বাড়ি আড়াইহাজার উপজেলার ফতেপুর ইউনিয়নের লতব্দী সিংগারপুরে। ঘটনার সময় বাড়ির সবাই জেগে ছিলেন। হঠাৎ ১৫ থেকে ২০ জনের একটি মুখোশধারী দল দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র ও পিস্তল নিয়ে বাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়ে। ডাকাতরা একে একে বাসার সাতটি দরজা ভেঙে পরিবারের সদস্যদের অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে রাখে।
তিনি আরও জানান, তারা ঘরের বিছানার নিচে ও আলমারিতে রাখা আনুমানিক সাত লাখ টাকা এবং ওয়াল কেবিনেটে সংরক্ষিত প্রায় চার ভরি স্বর্ণালংকার লুট করে নেয়। ডাকাতির সময় বাধা দিতে গেলে সিরাজ মিয়ার ছেলে সাইফুল ইসলামকে মারধর করে।
স্থানীয়রা জানান, ফতেপুর, আড়াইহাজার পৌরসভা, ব্রাহ্মন্দী, গোলালদী পৌরসভা, দুপতারা ইউনিয়ন, মাহমুদপুর ইউনিয়ন, সাতগ্রাম ইউনিয়নসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রায় প্রতিরাতেই ডাকাতি হচ্ছে। এমনও ঘটনা আছে যে, ৪০-৫০ জনের দল ঘরের দরজা ভেঙে ঢুকে অস্ত্রের মুখে নারী-শিশুদের জিম্মি করে দুই-তিন ঘণ্টাব্যাপী ডাকাতি করেছে। স্থানীয়রা ডাকাতদের ঘিরে ফেললে তারা ককটেল নিক্ষেপ করে এবং এলোপাতাড়ি কুপিয়ে পালিয়ে যায়। বৃহস্পতিবার রাতে সোনারগাঁ-আড়াইহাজার সড়কে ডাব বহনকারী ট্রাক ডাকাতি করে নিয়ে যায় ডাকাত দলের সদস্যরা। পরে ট্রাকের ড্রাইভার ও হেলপারকে হাত-পা বেঁধে আড়াইহাজার থানার বান্টি বাজারে নির্জন এলাকায় ফেলে পালিয়ে যায়।
একই রাতে আড়াইহাজার থানার সাতগ্রাম ইউনিয়নের পাঁচগাঁও এলাকায় মিন্টু ভূঁইয়ার বাড়িতে ডাকাতি হয়েছে। ৮ থেকে ১০ জন মুখোশধারী দেশীয় অস্ত্র নিয়ে বাড়ির গাছ বেয়ে বাউন্ডারি ওয়ালের ভেতরে প্রবেশ করে। পরে তারা মূল গেটের তালা কেটে ভবনের দরজা ভেঙে ঘরে ঢুকে। ডাকাতরা প্রায় চার ভরি স্বর্ণালঙ্কার নিয়ে যায়।
১১ জানুয়ারি রাতে উপজেলার মাহমুদপুর ইউনিয়নের কল্যান্দী মোড়ে মাহফিল থেকে ফেরার পথে ইসলামী বক্তা মুফতি হাবিবুল্লাহ সিদ্দিকীর গাড়িতে ডাকাতি হয়েছে। ডাকাতদের হামলায় হাবিবুল্লাহ সিদ্দিকী ও তার গাড়ির চালক গুরুতর আহত হয়েছেন।
২৩ ডিসেম্বর রাতে উপজেলার ব্রাহ্মন্দী ইউনিয়নের পাঁজারদিয়া গ্রামে স্বর্ণ ব্যবসায়ী মুনসুর আলম ও আনোয়ার মোল্লার বাড়িতে একযোগে ৩০-৪০ জনের সশস্ত্র ডাকাত দল হানা দেয়। এ সময় ডাকাত দল মুনসুর আলমের ঘর থেকে নগদ ৬৬ হাজার টাকা ও ১ ভরি স্বর্ণালংকার এবং আনোয়ার মোল্লার ঘর থেকে নগদ ১৫ হাজার টাকা ও দেড় ভরি স্বর্ণালংকার লুট করে। বাধা দেওয়ায় মুনসুর আলম ও তার স্ত্রী-সন্তানদের ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে জখম করে। ডাকাতি চলাকালে মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিলে স্থানীয়রা ডাকাত দলকে ঘেরাও করে ফেলে। এ সময় জড়ো হওয়া লোকজনকে এলোপাতাড়ি ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে ১৫ জনকে গুরুতর আহত করে পালিয়ে যায় ডাকাত দল। এসময় ডাকাতরা বেশ কয়েকটি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। ২ জানুয়ারি ওই ইউনিয়নের বাসিন্দারা ডাকাতের উৎপাতে অতিষ্ঠ হয়ে এলাকায় প্রতিবাদ মিছিল ও সমাবেশ করেছে।
এদিকে সোমবার ভোরে যৌথবাহিনী মর্দাসাদী এলাকায় অভিযান চালিয়ে দুই ডাকাতকে আটক করেছে। এরা হলো-মো. নোয়াব আলী ও মো. সোহেল। তাদের বিরুদ্ধে একাধিক ডাকাতির মামলা রয়েছে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) আড়াইহাজার উপজেলা শাখার সভাপতি মো. মনিরুজ্জামান সরকার জানান, আড়াইহাজার উপজেলা একটি ডাকাতপ্রবণ এলাকা। দুটি পৌরসভা ও দশটি ইউনিয়নের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ব্যর্থ। টহল পুলিশ রাস্তায় ডিউটি না করে রাতে চায়ের দোকানে আড্ডা দিয়ে সময় পার করে। যে কারণে প্রতিরাতেই ডাকাতি হচ্ছে। তিনি বলেন, আশপাশের জেলার ডাকাতরা স্থানীয় ডাকাতদের সহযোগিতায় ডাকাতি করছে। যারা ডাকাতি করছে, তাদের বাড়িঘর আড়াইহাজারে নয়।
এ ব্যাপারে নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান মুন্সি বলেন, ডাকাতি প্রতিরোধে পুলিশ, র্যাবসহ যৌথ বাহিনী কাজ করছে। তারপরও ডাকাতির ঘটনা ঘটছে। তিনি বলেন, সম্প্রতি বেশ কয়েকজন ডাকাতকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ফতেপুর ইউনিয়নের মৎস্য ব্যবসায়ীর বাড়িতে ডাকাতির ঘটনায় মামলা হয়েছে। ডাকাতদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

