ডেইলি নারায়ণগঞ্জ টুয়েন্টিফোর ডটকমঃ বাজারে ডলারের বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখতে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে অতিরিক্ত ডলার সংগ্রহ করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই প্রক্রিয়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরাসরি বাজারে না গিয়ে ব্যাংকগুলোর উদ্বৃত্ত ডলার তুলে নিচ্ছে, যা যুক্ত হচ্ছে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার মজুতে। ফলে কাগজে-কলমে রিজার্ভ বাড়লেও বাস্তব অর্থনীতিতে এর প্রভাব নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই উদ্যোগে স্বল্পমেয়াদে ডলার বাজারে স্বস্তি ফিরলেও দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ, আমদানি ও উৎপাদন খাতে চাপ বাড়তে পারে এমন আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী ও অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জনকণ্ঠকে বলেন, ডলার কেনা কোনো লাভ-ক্ষতির হিসাবের সিদ্ধান্ত নয়। বাস্তব বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়েই কেন্দ্রীয় ব্যাংককে অনেক সময় নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে হয়। তিনি বলেন, ব্যবসা পরিচালনায় উদ্যোক্তাদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা জরুরি। কোনো প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর নতুন মেশিনারি আমদানি করতে চাইলে শুধু যন্ত্রপাতি নয়, কাঁচামাল, উৎপাদন পরিকল্পনা ও ভবিষ্যৎ চাহিদার বিষয়ও বিবেচনায় রাখতে হয়। বর্তমানে ডলার বাজারে কিছুটা স্বস্তি থাকলেও সামনে বাড়তি চাহিদার চাপ কতটা সামাল দেওয়া যাবে তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
ডলার কেনায় নগদ বাজারে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে কি না, এ প্রশ্নে তিনি স্পষ্ট করেন, বাংলাদেশ ব্যাংক সরাসরি বাজার থেকে ডলার কেনে না। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো প্রয়োজনীয় ডলার রেখে অতিরিক্ত অংশ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে হস্তান্তর করে। ব্যাংকগুলোর ডলার ধারণের একটি নির্ধারিত সীমা রয়েছে এবং নেট ওপেন পজিশনের বাইরে গিয়ে তারা ডলার ধরে রাখতে পারে না।
ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ মনে করছেন, এই মুহূর্তে কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি বাজার থেকে ডলার না তুলত তাহলে সরবরাহ হঠাৎ বেড়ে গিয়ে ডলারের দাম অস্বাভাবিকভাবে কমে যেত। এতে রপ্তানিকারকরা আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা হারাতেন।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) নির্বাহী সভাপতি এবং এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের সভাপতি ফজলে শামীম এহসান জনকণ্ঠকে বলেন, ভবিষ্যতে বিনিয়োগবান্ধব সরকার এলে ডলারের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। এখন ডলার সংরক্ষণ না করা হলে তখন বিনিময় হার ১১০ টাকা থেকে ১৩০ টাকায় লাফ দিতে পারে, যা আমদানিকারকদের জন্য বড় ধাক্কা হবে।
তার মতে ডলারের দামের চেয়ে স্থিতিশীলতাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এই স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে বাজার থেকে ডলার কেনার বিকল্প নেই এবং সরকার সঠিক পথেই হাঁটছে।
তবে অর্থনীতিবিদরা বিষয়টি দেখছেন আরও সতর্ক দৃষ্টিতে। চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের রিসার্চ ফেলো অর্থনীতিবিদ এম হেলাল আহমেদ জনি জনকণ্ঠকে বলেন, ডলার কিনে রিজার্ভ বাড়ানো তখনই সমস্যার কারণ হয় যখন তা অর্থনীতির বাস্তব অবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয়। সঠিক সময়ে এটি বাজারে স্থিতিশীলতা আনতে পারে, কিন্তু ভুল সময়ে হলে মুদ্রাস্ফীতি ও বাজারের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
বর্তমানে অতিরিক্ত ডলার রিজার্ভে যুক্ত হওয়ায় বেসরকারি খাতে ডলারের প্রাপ্যতা কিছুটা সংকুচিত হচ্ছে। এর প্রভাব পড়তে পারে এলসি খোলা ও আমদানি ব্যয়ের ওপর।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও অর্থনীতিবিদ ড. আব্দুল বায়েস জনকণ্ঠকে বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক ডলার কিনছে মূলত রিজার্ভ বাড়ানোর জন্য নয়, বরং ডলারের দাম যেন অতিরিক্ত কমে বা বেড়ে না যায় সেই লক্ষ্যেই। তিনি বলেন, বাজারে ডলারের সরবরাহ হঠাৎ বেড়ে গেলে দাম পড়ে যেতে পারে, যা রেমিটেন্স ও রপ্তানি খাতের জন্য ক্ষতিকর। এই ঝুঁকি এড়াতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক অতিরিক্ত ডলার কিনে নেয় এবং প্রয়োজনে আবার ছেড়ে দেয়। এটি ডলার বাজারে একটি দ্বিমুখী হস্তক্ষেপ।
ড. বায়েসের ভাষায় রিজার্ভ বাড়ছে ঠিকই, কিন্তু প্রশ্ন হলো এই রিজার্ভ কী কাজে লাগছে। যদি একই সঙ্গে আমদানি, বিনিয়োগ ও উৎপাদন বাড়ত তাহলে এর বাস্তব অর্থ থাকত। বর্তমানে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি স্থবির। চর্বি বাড়ছে, কিন্তু এক্সারসাইজ নেই।
বিশেষজ্ঞদের মতে স্বল্পমেয়াদে ডলারের দাম একটি ‘স্ট্যাবল জোনে’ রাখা জরুরি হলেও দীর্ঘমেয়াদে প্রকৃত বিনিয়োগ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়ানো ছাড়া ডলার বাজারের টেকসই সমাধান সম্ভব নয়। ডলারের অস্থিতিশীলতাই রেমিটেন্স, রপ্তানি ও আমদানির জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি এ বিষয়ে সবাই একমত।
বাজার নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংকের দ্বিমুখী হস্তক্ষেপ নিয়ে বিতর্ক

