ডেইলি নারায়ণগঞ্জ টুয়েন্টিফোর ডটকমঃ নারায়ণগঞ্জ-৪ (ফতুল্লা) আসনটি বিএনপি তার জোট প্রার্থীকে ছেড়ে দিয়েছে। এ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে এখানে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন বিএনপির দুই প্রভাবশালী নেতা। বিক্ষুব্ধ আরেক নেতা বিএনপি ছেড়ে বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টিতে যোগ দিয়ে দলটির প্রার্থী হয়েছেন। তিনি এক সময় বিএনপি থেকে এমপি হয়েছিলেন। বিএনপির ভোটারদের মধ্যে তিনজনেরই প্রভাব রয়েছে। তিনজনের ভোট কাটাকাটিতে বের হয়ে যেতে পারেন জোট প্রার্থী। এ আশঙ্কায় কর্মীদের চাপে এই তিন নেতার এক হওয়ার একটি চেষ্টা চলছে বলে গুঞ্জন রয়েছে।
নারায়ণগঞ্জ-৪ (ফতুল্লা) আসনটি বিএনপি তার জোটের শরিক দল জমিয়তে উলামায়ে ইসলামকে ছেড়ে দিয়েছে। এ আসনে এ দলের প্রার্থী মুফতি মনির হোসাইন কাসেমী।
তাঁকে মনোনয়ন দেওয়ার পর স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদ্য সাবেক সদস্য শাহ্ আলম ও জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মুহম্মদ গিয়াস উদ্দিন। আর সাবেক এমপি মোহাম্মদ আলী বিএনপি ছেড়ে এখন রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থী।
শাহ্ আলম ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের সারাহ বেগম কবরীর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হন। ফতুল্লায় শাহ্ আলমের পরিবারের রয়েছে বিশাল স্পিনিং মিলসহ বিভিন্ন ধরনের ব্যবসা। এলাকায় রয়েছে তাদের পারিবারিক প্রভাব। স্থানীয় বিএনপির একটি বড় অংশ তাঁর সমর্থক।
স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে মোহাম্মদ আলীর প্রভাবও ব্যাপক। তিনি ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে এ আসন থেকে বিএনপির এমপি হয়েছিলেন। ফতুল্লার নদীবেষ্টিত চরাঞ্চল বক্তাবলীতে বিদ্যুৎ ও সড়ক নির্মাণে তাঁর রয়েছে উল্লেখযোগ্য অবদান। মুহম্মদ গিয়াস উদ্দিনও নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সাবেক এমপি। ২০০১ এর নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের শামীম ওসমানকে ৩১ হাজার ২১৯ ভোটে পরাজিত করেছিলেন। সংগঠক হিসেবে মুহম্মদ গিয়াস উদ্দিনের সুনাম রয়েছে। ছাত্রজীবন থেকে তিনি রাজনীতির সঙ্গে জড়িত।
এই তিনজন মাঠে থাকলে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের ভোটের বাক্সে তা প্রভাব ফেলবে বলে মনে করেন দলটির নেতাকর্মীরা। ফতুল্লা থানা বিএনপির সহসভাপতি মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ বলেন, যারা বিএনপির নেতাকর্মী আছি, তারা দলের সিদ্ধান্তের পক্ষে। আমরা জোট প্রার্থী মনির হোসাইন কাসেমীর পক্ষে কাজ করছি। আমরা দলের রাজনীতি করি। কোনো ভাইয়ের রাজনীতি করি না। তবে এটা সত্য, তারা তিনজনই বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে জড়িত। তাই তারা নির্বাচন করলে বিএনপি জোটের ভোট কিছু হলেও কমে যাবে।
দলীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আশঙ্কায় এই তিনজনের পক্ষে প্রকাশ্যে বক্তব্য দিতে চান না বিএনপির নেতারা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ফতুল্লা আসনের ফতুল্লা ও কুতুবপুর ইউনিয়ন এলাকার বাসিন্দা বিএনপির একাধিক প্রবীণ নেতা বলেন, এ আসনে আমরা দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের এমপি শামীম ওসমানের দ্বারা নির্যাতিত হয়েছি। ফতুল্লায়
সংগঠন দুর্বল হয়ে গেছে। এখানে যদি বিএনপির এমপি থাকে তাহলে এ আসনে আমরা দলকে আবার শক্তিশালী করতে পারব। কিন্তু এমপি না থাকলে স্বাভাবিকভাবেই সেটা সম্ভব নয়। তাই এখানে জোট প্রার্থী মনির হোসাইন কাসেমীর পক্ষে অনেকেই মাঠে নামছে না। আবার দলীয় শাস্তির ভয়ে অনেকে মাঠে নামলেও ভেতরে ভেতরে তিন নেতার কারো না কারো সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা আন্তরিকভাবে চাচ্ছেন শাহ্ আলম, গিয়াস উদ্দিন, মোহাম্মদ আলীর মধ্যে সমঝোতা হোক। তারা যে কোনো একজন নির্বাচনটা করুন।
নেতাকর্মীদের এই চাহিদা থেকেই সম্প্রতি এই তিন প্রার্থীর মধ্যে পৃথক বৈঠক হয়েছে বলে
জানা গেছে। মূলত বিএনপি ত্যাগী বর্তমান রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থী মোহাম্মদ আলী বাকি দুজন প্রার্থীর সঙ্গে বৈঠক করে ঐক্যের চেষ্টা করছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মোহাম্মদ আলীর ঘনিষ্ঠ জেলা বিএনপির দুজন শীর্ষ নেতা সমকালকে জানান, গত সপ্তাহে রিপালিকান পার্টির নির্বাহী চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলী পৃথকভাবে স্বতন্ত্র প্রার্থী শাহ্ আলম ও গিয়াস উদ্দিনের সঙ্গে বসেছেন। পরে তিনি শাহ্ আলমের সঙ্গে আরেক দফা বৈঠক করেন। তিনি দুজনকেই তাঁকে আসনটি ছেড়ে দিয়ে বসে যাওয়ার প্রস্তাব দেন। তাদের মধ্যে গিয়াস উদ্দিন নারায়ণগঞ্জ-৪ (ফতুল্লা) এর পাশাপাশি নারায়ণগঞ্জ-৩ (সিদ্ধিরগঞ্জ-সোনারগাঁ) থেকেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
সূত্র জানায়, বৈঠকে মোহাম্মদ আলীর প্রস্তাব শুনে শাহ্ আলম ২০০৮ সালের নির্বাচনের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। প্রথম বৈঠকে শাহ্ আলম বলেন, ওই নির্বাচনে আমি ফেল করিনি। প্রশাসনকে ব্যবহার করে আমাকে ফেল করানো হয়েছে। তখন পরিস্থিতি প্রতিকূল ছিল। এবার পরিস্থিতি বিএনপির পক্ষে। একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন হবে। সেখানে আমি কেন আমার পুরোনো পাওনা নেব না? জবাবে মোহাম্মদ আলী বলেন, তাঁর জনপ্রিয়তা আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ সব দলের মধ্যে রয়েছে। এর সঙ্গে শাহ আলমের সমর্থন যোগ হলে তিনি অনায়াসে জয়ী হতে পারবেন। দ্বিতীয় বৈঠকটি তারা একান্তে করেন। সেখানে তারা তৃতীয় কাউকে রাখেননি। ফলে এ বৈঠকের বিষয়ে কিছু জানা যায়নি।
স্থানীয় বিএনপি নেতারা জানান, বিএনপির চেয়ারম্যান স্বতন্ত্র প্রার্থী শাহ্ আলমকে ডেকে নিয়েছিলেন। শাহ্ আলমকে তিনি কাসেমীর পক্ষে কাজ করতে বলেন। ভবিষ্যতে দল তাঁকে দেখবে বলে আশ্বাস দেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ফতুল্লা বিএনপির ওই দুই নেতা আরও জানান, শাহ আলমের সঙ্গে বসার দুদিন পরে মোহাম্মদ আলী বসেন গিয়াস উদ্দিনের সঙ্গে। তাঁকে তিনি ফতুল্লা আসন ছেড়ে দিয়ে সোনারগাঁয়ে নির্বাচন করার অনুরোধ জানান।
তাদের বৈঠকগুলো থেকে চূড়ান্ত কোনো ফল হয়নি। আবার কেউ কারো প্রস্তাব একেবারে ফেলেও দেননি। আগামী ১৮ জানুয়ারি তাদের তিনজনের মধ্যে একটি বৈঠক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানিয়েছে এই সূত্র। বৈঠকগুলোর কথা সমকালের কাছে স্বীকার করেননি এ তিনজনের কেউ।
মোহাম্মদ আলীর সঙ্গে বৈঠক ও দলীয় চেয়ারম্যানের সঙ্গে বৈঠক দুটোই অস্বীকার করেন নারায়ণগঞ্জ-৪ (ফতুল্লা) আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী মোহাম্মদ শাহ্ আলম। তিনি বলেন, এ ধরনের কোনো বৈঠক হয়নি। তবে আমি ঐক্যের পক্ষে। আমি চাই গিয়াস ভাই, আলী ভাই আমাকে সমর্থন দিক। মোহাম্মদ আলী এ প্রসঙ্গে বলেন, আমি কারো সঙ্গে বৈঠক করিনি। কেউ আমার সঙ্গে যোগাযোগও করেনি। বৈঠকে কোনো খবর সত্য নয়। গিয়াস উদ্দিন বলেন, এ ধরনের কোনো বৈঠক হয়নি। এর বাইরে তিনি কোনো কথা বলতে রাজি হননি।
ফতুল্লা ও শহরের বাসিন্দা জেলা বিএনপির শীর্ষ ওই দুই নেতা আরও জানান, গিয়াস উদ্দিন নারায়ণগঞ্জ-৩ (সিদ্ধিরগঞ্জ-সোনারগাঁ) আসনে বিএনপির প্রার্থী আজহারুল ইসলাম মান্নানের মনোনয়ন বাতিলের জন্য নির্বাচন কমিশনে আপিল করেছেন। এ আপিলের শুনানি হবে আগামীকাল ১৭ জানুয়ারি। আপিল শুনানিতে মান্নানের মনোনয়ন বাতিল হলে এ আসনে গিয়াস উদ্দিনের নির্বাচন করার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। বিএনপির সাবেক প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক রেজাউল করিমও এ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী।
মান্নানের মনোনয়ন বাতিল হলে গিয়াস উদ্দিন নারায়ণগঞ্জ-৪ (ফতুল্লা) এর প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নিতে পারেন বলে এই দুই নেতা জানান। সে ক্ষেত্রে ফতুল্লা আসনে জোট প্রার্থীর বিপরীতে থাকবেন বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী শাহ আলম ও রিপাবলিকান পার্টির মোহাম্মদ আলী।

