ডেইলি নারায়ণগঞ্জ টুয়েন্টিফোর ডটকমঃ ইরানে যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালাবে না বলে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একই সঙ্গে ইরানকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। পাকিস্তানে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত রেজা আমিরি মোগাদাম বৃহস্পতিবার এ তথ্য জানিয়েছেন। ট্রাম্পের সুর নরম হলেও হামলার বিষয়ে এখনো উদ্বিগ্ন রয়েছে ইরান। তবে নিরাপত্তাজনিত কারণে অস্থায়ী সময়ের জন্য বন্ধ করে আবারও নিজেদের আকাশসীমা খুলে দিয়েছে ইরান।
এদিকে ইরানে সরকারবিরোধী আন্দোলনে যোগ দিয়ে গ্রেপ্তার ও ফাঁসির সাজাপ্রাপ্ত তরুণ এরফান সোলতানির মৃত্যুদ- স্থগিত করেছে দেশটির সরকার। অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে উত্তেজনার মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে বিমানবাহী রণতরী পাঠাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। ভেনিজুয়েলাকে চাপে রাখার জন্য প্রায় সব যুদ্ধজাহাজ ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে নিয়ে গিয়েছিল মার্কিন সরকার। এ কারণে মধ্যপ্রাচ্যে কোনো রণতরী ছিল না। নিউজন্যাশন জানিয়েছে, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন এবং এটির স্ট্রাইক গ্রুপকে দক্ষিণ চীন সাগর থেকে মধ্যপ্রাচ্যে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। খবর দ্য ডন, আলজাজিরা ও সিএনএনের।
ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হামলা ঠেকিয়েছে সৌদি আরব, ওমান ও কাতার। এ তিন দেশের কূটনৈতিক তৎপরতায় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হামলার পরিকল্পনা থেকে সরে এসেছেন বলে জানিয়েছেন সৌদির এক কর্মকর্তা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বৃহস্পতিবার তিনি এএফপিকে বলেছেন, গালফ অঞ্চলের তিন দেশ শেষ মুহূর্তের কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে ট্রাম্পকে বোঝাতে সমর্থ হয়েছেন যে, ইরানকে ভালো মনমানসিকতা প্রদর্শনের জন্য যেন আরেকটি সুযোগ দেওয়া হয়। দেশগুলো ট্রাম্পকে সতর্কতা দিয়েছে, যদি তিনি ইরানে হামলা চালানোর নির্দেশ দেন তাহলে এ অঞ্চলে গুরুতর ধাক্কা আসবে।
ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলেছেন, সীমিত বিকল্প ও সক্ষমতার কারণে মার্কিন সেনাবাহিনী ইরানে হামলা চালাতে এখন প্রস্তুত নয়। বৃহস্পতিবার মার্কিন সংবাদমাধ্যম এনবিসি নিউজের সূত্রের বরাত দিয়ে দ্য টেলিগ্রাফের প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়। এর আগে মঙ্গলবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে বিক্ষোভকারীদের আশ্বাস দিয়ে বলেছিলেন, সাহায্য আসছে। পরদিন কাতারে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিমান ঘাঁটি থেকে কিছু সেনা প্রত্যাহার করা হয়। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের এলাকাটি ত্যাগ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়। এছাড়া ব্রিটেনও হঠাৎ করে তেহরানে দূতাবাস বন্ধ এবং কাতার থেকে তাদের কিছু বাহিনী প্রত্যাহার করে। বুধবার ইউরোপীয় সূত্র জানায়, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালাতে পারে। তবে স্থানীয় সময় বুধবার সন্ধ্যায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট কার্যত সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপ থেকে এক ধাপ পিছিয়ে আসেন বলে ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
ইরানের রাষ্ট্রদূত রেজা আমিরি মোগাদাম বলেছেন, ট্রাম্পের এ বার্তা নির্দেশ করছে তিনি ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ চান না এবং দেশটিকে আহ্বান জানিয়েছেন মধ্যপ্রাচ্যে থাকা তাদের অবকাঠামোতে যেন কোনো পাল্টা হামলা না চালানো হয়। তিনি বলেন, ইরানের মানুষের বিক্ষোভ করার অধিকার রয়েছে এবং সরকার বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে বৈঠকে বসেছে। তিনি দাবি করেছেন, বিক্ষোভ চলার সময় সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা হত্যাকা- ঘটানো ও মসজিদে হামলা চালিয়েছে। গত কয়েকদিন ইরানে হামলার হুমকি দিলেও বুধবার রাতে সুর নরম করে কথা বলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
তিনি বলেন, বিশ্বস্ত সূত্রে জানতে পেরেছেন ইরান বিক্ষোভকারীদের হত্যা করা বন্ধ করে দিয়েছে এবং কোনো বিক্ষোভকারীর মৃত্যুদ-ও কার্যকর করবে না। এতে করে যুক্তরাষ্ট্রের অত্যাসন্ন হামলার শঙ্কা অনেকটাই কমেছে। তবে ইরানের তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক হাসান আহমাদিয়ান বলেছেন, ইরান বিক্ষোভকারীদের হত্যা করা বন্ধ করে দিয়েছে ট্রাম্প একাধিকবার এমন বক্তব্য দেওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলার শঙ্কা কমে গেছে। ইরানের সরকার এমনটা সম্ভবত বিশ্বাস করবে না। তিনি জানিয়েছেন, যদিও ট্রাম্পের বক্তব্য ইঙ্গিত করছে ওয়াশিংটন উত্তেজনা হ্রাস চায়।
তা সত্ত্বেও ইরানের নেতৃবৃন্দ যুক্তরাষ্ট্রের হামলা নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকবেন। তিনি বলেন, আমি মনে করি মার্কিন প্রেসিডেন্ট যা বলেন তা ইরানিদের বিশ্বাস করতে কষ্ট হবে। কারণ এর আগে ইরানিরা যখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় ছিল তখন দেশটি হামলার শিকার হয়েছে। এদিকে ফ্লাইট ট্র্যাকিং ডাটায় দেখা গেছে ইরানের আকাশসীমায় আবারও বিমান প্রবেশ করছে। ফ্লাইটরাডার২৪ নিশ্চিত করেছে ইরানের আকাশসীমা বন্ধের নোটিসের সময় শেষ হয়ে গেছে। এরপর বিমান আবারও দেশটিতে প্রবেশ করা শুরু করে। বৃহস্পতিবার সকালে নির্দিষ্ট ও অনুমোদিত ফ্লাইট বাদে নিজেদের আকাশসীমায় সব ধরনের বিমান চলাচল বন্ধ করে দেয় তেহরান।
যুক্তরাষ্ট্রের হামলার শঙ্কা ও দেশব্যাপী বিক্ষোভের মুখে ইরান তাদের আকাশসীমা বন্ধ করে দিয়েছিল। গত ২৮ ডিসেম্বর ইরানে বিক্ষোভ শুরু হয়, যা দ্রুত সময়ে সহিংস রূপ ধারণ করে। বিক্ষোভকারীরা সরকারি অবকাঠামো, মসজিদ, পুলিশের গাড়িতে আগুন দেয়। এরপর নিরাপত্তাবাহিনী কঠোর অবস্থান নেয়। এতে হাজার হাজার বিক্ষোভকারী ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য প্রাণ হারান। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী বিক্ষোভ এখন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আছে এবং কোনো বিক্ষোভকারীকে আর তেহরান বা অন্যান্য বড় শহরে দেখা যাচ্ছে না।
ইরানে সরকারবিরোধী আন্দোলনে যোগ দিয়ে গ্রেপ্তার ও ফাঁসির সাজাপ্রাপ্ত ২৬ বছর বয়সী তরুণ এরফান সোলতানি পেশায় দোকান ব্যবসায়ী। রাজধানী তেহরানের শহরতলী এলাকা কারাজে তার বাসা। সরকারবিরোধী বিক্ষোভে যোগ দেওয়ার অভিযোগে গত ৮ জানুয়ারি কারাজে নিজ বাসা থেকে গ্রেপ্তার হন তিনি। তারপর মাত্র তিনদিনের বিচারের ভিত্তিতে তাকে ফাঁসির দ- দেওয়া হয়। আদালতের বিচার প্রক্রিয়ায় সোলতানির পরিবারের কোনো স্বজন কিংবা বন্ধুকে উপস্থিত থাকতে দেওয়া হয়নি। ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ানের বরাতে জানা গেছে সোলতানির বোন একজন নিবন্ধিত ও পেশাদার আইনজীবী। তিনিও থাকতে পারেননি। বুধবার তার মৃত্যুদ- কার্যকর করার কথা ছিল।
সোলতানির আত্মীয় সোমায়েহ নামের এক নারী বলেছেন, তারা খবর পেয়েছেন যে, সোলতানির দ- কার্যকর হয়নি। তবে তার দ- এখন পর্যন্ত বাতিলও হয়নি। আমরা আরও তথ্যের অপেক্ষায় আছি। পরে মানবাধিকার সংস্থা হেনগাও এক প্রতিবেদনে জানায় যে, সোলতানির মৃত্যুদন্ড স্থগিত করা হয়েছে। এদিকে বুধবার উচ্চ সতর্কতা জারির পর কাতারে অবস্থিত আল উদেইদ মার্কিন বিমান ঘাঁটিতে নিরাপত্তা সতর্কতার মাত্রা কমিয়ে আনা হয়েছে।
বিষয়টি সম্পর্কে অবগত তিনটি সূত্র বৃহস্পতিবার রয়টার্সকে এ তথ্য জানিয়েছে। এর মধ্যে একটি সূত্র বলেছে বুধবার ওই ঘাঁটি থেকে যেসব মার্কিন বিমান অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল সেগুলো ধীরে ধীরে আবার ঘাঁটিতে ফিরতে শুরু করেছে। এদিকে পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে কূটনৈতিক সূত্র হিসেবে পরিচিত আরও দুটি সূত্র জানায়- যেসব কর্মীকে আগে ঘাঁটি ছাড়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল তাদের একটি অংশকে ফিরে আসার অনুমতিও দেওয়া হয়েছে। ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে নিহত ব্যক্তির সংখ্যা বেড়ে ৩ হাজার ৪২৮ জনে দাঁড়িয়েছে। নরওয়েভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা ইরান হিউম্যান রাইটস (আইএইচআর) বৃহস্পতিবার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে। সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, শত শত বিক্ষোভকারীকে মৃত্যুদ- দেওয়ার গুরুতর ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

