ডেইলি নারায়ণগঞ্জ টুয়েন্টিফোর ডটকমঃ আর্থিক চাপ, মূল্যস্ফীতির বাস্তবতা ও ঘনিয়ে আসা জাতীয় সংসদ নির্বাচনের হিসাব মিলিয়ে সরকারি কর্মচারীদের নতুন পে স্কেল ঘোষণা থেকে সরে যাওয়ার পথে হাঁটছে অন্তর্বর্তী সরকার। প্রশাসনের ভেতরে ও বাইরে যখন নতুন বেতন কাঠামো নিয়ে প্রত্যাশা বাড়ছিল, তখন সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে এই মেয়াদে পে স্কেল ঘোষণা করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে কাজ থেমে থাকছে না; এ লক্ষ্যে গঠিত পে কমিশনকে পূর্ণোদ্যমে কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নতুন পে স্কেল কার্যকর না হলেও একটি পূর্ণাঙ্গ কাঠামো বা ফ্রেমওয়ার্ক প্রস্তুত করা হবে, যা পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের জন্য ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে। সর্বশেষ বৃহস্পতিবার এ নিয়ে পে কমিশনের দীর্ঘ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে সভাপতিত্ব করেন কমিশনের চেয়ারম্যান ও সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খান।
পে কমিশনের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, কমিশন তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদন অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে জমা দেবে। তবে সরকারের হাতে সময় কম থাকায় এই বেতন কাঠামো ঘোষণা করা হবে না। বরং প্রতিবেদনটি নির্বাচনের পর গঠিত নতুন সরকারের কাছে হস্তান্তর করা হবে, যারা পরবর্তী সময়ে তা বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেবে।
সূত্রটি আরও জানায়, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, আর্থিক সংকট এবং সামাজিক বাস্তবতা বিবেচনায় সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হলেও এর ঘোষণা আপাতত পিছিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতিতে সরকারের মনোযোগ কেন্দ্রীভূত থাকায় নির্বাচন-পূর্ব সময়ে নতুন পে স্কেল ঘোষণার সম্ভাবনা কার্যত নেই।
তবে পে কমিশন প্রতিবেদন জমা দিলে বর্তমান সরকার সেটির আলোকে একটি সুপারিশমালা চূড়ান্ত করবে, যা ভবিষ্যৎ সরকার বাস্তবায়ন করবে। এ সময় পর্যন্ত সরকারি চাকরিজীবীরা বিদ্যমান বিধি অনুযায়ী মহার্ঘ ভাতা পেতে থাকবেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরও গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের আগে নতুন পে স্কেল ঘোষণার কোনো সম্ভাবনা নেই এবং অন্তর্বর্তী সরকার এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না নেওয়াটাই বাস্তবসম্মত।
পে কমিশনের সূত্রে জানা গেছে, নতুন বেতন কাঠামো প্রণয়নে বেতনের অনুপাত নিয়ে তিনটি বিকল্প—১:৮, ১:১০ ও ১:১২—পর্যালোচনা করা হয়েছে। এর মধ্যে ১:৮ অনুপাতকে চূড়ান্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ সর্বনিম্ন গ্রেডের বেতনকে ভিত্তি ধরে সর্বোচ্চ গ্রেডের বেতন হবে তার আট গুণ। সর্বনিম্ন বেতন নির্ধারণে ২১ হাজার, ১৭ হাজার ও ১৬ হাজার টাকার প্রস্তাব আলোচনায় রয়েছে।
অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কমিশনকে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে এবং এ ক্ষেত্রে দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থা ও মূল্যস্ফীতিকে গুরুত্ব দিতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, সময় উপযোগী একটি বেতন কাঠামো প্রস্তুত করাই সরকারের লক্ষ্য, তবে নির্বাচন প্রস্তুতির কারণে সময় পাওয়া গেলে তবেই তা ঘোষণা করা সম্ভব হবে।
পে কমিশনের প্রতিবেদনে শুধু বেতন বৃদ্ধি নয়, বরং ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি, নিত্যপণ্যের দাম, পরিবারের সদস্য সংখ্যা, আবাসন ও শিক্ষা ব্যয়কেও মূল সূচক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। এই পূর্ণাঙ্গ ফ্রেমওয়ার্কই ভবিষ্যৎ সরকারের জন্য নতুন পে স্কেল নির্ধারণের প্রধান রেফারেন্স হবে। সংশ্লিষ্টদের আশা, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই এই সুপারিশের ভিত্তিতে নবম পে স্কেলের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হবে।
উল্লেখ্য, জাতীয় বেতন কমিশন ২০২৫ সালের ২৭ জুলাই গঠিত হয়। সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে গঠিত এই কমিশনের মেয়াদ চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির মধ্যে শেষ হওয়ার কথা, যা জাতীয় নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে প্রায় সমাপ্ত হবে।
পে স্কেল ঘোষণা থেকে সরে আসছে অন্তর্বর্তী সরকার

