ডেইলি নারায়ণগঞ্জ টুয়েন্টিফোর ডটকমঃ হঠাৎ করেই মাত্র ১০ মাসের জন্য প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন ও মানবণ্টনে পরিবর্তন নিয়ে শিক্ষামহলে শোরগোল চলছে। অভিযোগ উঠেছে, বিতর্কিত এই সিদ্ধান্ত কোন অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা ছাড়াই শিক্ষার্থীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ২০২৭ সালে নতুন কারিকুলাম বাস্তবায়নের আগে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এমন সিদ্ধান্ত শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি করেছে। এমন অবস্থায় আগামীকাল মঙ্গলবার মন্ত্রণালয় একটি বিশেষ পর্যালোচনা সভা আহ্বান করা হয়েছে। সভাটি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা এবং সচিবের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত হবে। সেখানেই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া।
সংশ্লিষ্টরা জানান, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার আসার পর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২০২৭ সাল থেকে নতুন কারিকুলামে শিক্ষার্থীদের পড়ানো হবে। কিন্তু ঠিক আগের বছর হঠাৎ মূল্যায়ন পদ্ধতি ও মানবণ্টন আবারও পরিবর্তনের কাজ করেছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে নতুন পদ্ধতি তৈরি করেছে তারা। যে প্রক্রিয়ার মূল্যায়ন করা হবে তাতে যেন বিতর্কিত আগের ধারায় ফিরিয়ে আনা হয়েছে। শিক্ষাবিদরা বলছেন, এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে পর্যালোচনা করা উচিত। কিন্তু মন্ত্রণালয় পরামর্শক কমিটির সুপারিশকে অবজ্ঞা করে এই সিদ্ধান্ত কোটি শিক্ষার্থীর ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। জাতীয় নির্বাচনের আগে এমন সিদ্ধান্ত শিক্ষাক্ষেত্রে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবু নূর মো. শামসুজ্জামান বলেন, নির্দেশিকাটি এখনো খসড়া পর্যায়ে রয়েছে। এ সপ্তাহেই মন্ত্রণালয়ে এটি নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। তিনি আরও বলেন, ‘সামনে যেহেতু জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নতুন সরকারের কারিকুলাম বা শিক্ষাক্রম নিয়ে ভিন্ন কোনো পরিকল্পনা থাকতে পারে। প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় কোনো নতুন পদ্ধতি প্রয়োগ করতে হলে অনেক চিন্তা-ভাবনা করে করতে হয়। তাই নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতি চালুর আগে সব দিক গভীরভাবে পর্যালোচনা করা হবে। শিক্ষার্থীদের স্বার্থ ও শিক্ষার মান নিশ্চিত করাই আমাদের মূল লক্ষ্য।’
প্রাথমিক শিক্ষকরা বলছেন, মাত্র ১০ মাসের জন্য নতুন মূল্যায়ন কোনোভাবেই মানা যায় না। এর সঙ্গে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের বিষয় রয়েছে। প্রশিক্ষণে কোটি কোটি টাকারও অপচয় হবে। সরকারের উচিত হবে এই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসা।
এর আগে গত ২১ ডিসেম্বর মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক পত্রে ২০২৬ শিক্ষাবর্ষে এটি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে চূড়ান্ত অনুমোদন ও নির্দেশনা জারির অনুরোধ জানিয়েছে এনসিটিবি। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, শিক্ষক, বিশেষজ্ঞ, পিটিআই ইনস্ট্রাক্টর, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত কমিটির সুনির্দিষ্ট মতামতের ভিত্তিতে এই নির্দেশিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। এনসিটিবি চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. মাহবুবুল হক পাটওয়ারী বলেন, ‘প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুরোধে শিক্ষার্থীদের শিখন নিশ্চিত করতে আমরা একটি সমন্বিত মূল্যায়ন নির্দেশিকা পাঠিয়েছি। তবে-এ বিষয়ে প্রশাসনিক মন্ত্রণালয় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও নির্দেশনা জারি করবে, আমরা শুধু বাস্তবায়ন করব।’
এনসিটিবি সূত্র বলছে, নতুন এই পদ্ধতিতে দেখা যায় ১ম ও ২য় শ্রেণিতে আগে শ্রেণি কার্যক্রম থাকলেও ২০২৬ সালে সামষ্টিক মূল্যায়নে (লিখিত পরীক্ষা) যুক্ত করা হয়েছে। ৩য়, ৪র্থ ও ৫ম শ্রেণিতে শ্রেণি মূল্যায়ন ও সামষ্টিক মূল্যায়নের সঙ্গে নতুন করে ব্যবহারিক ও মৌখিক পরীক্ষা যুক্ত হয়েছে। নতুন এই মূল্যায়ন প্রস্তাবনা বাস্তবায়ন করতে শিক্ষকদের ব্যাপক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। এ জন্য ৪ মাস পর্যন্ত সময় প্রয়োজন হবে। আর জাতীয় নির্বাচন ও রোজার জন্য ২ মাস বন্ধ থাকবে। এতে ব্যাপকহারে পাঠদান ব্যাহতের শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
যা থাকছে মূল্যায়নে ॥ প্রান্তিক মূল্যায়নকে দুই ধাপে ধারাবাহিক ও সামষ্টিক মূল্যায়নে ভাগ করা হয়েছে। ধারাবাহিক মূল্যায়নে পাঠ্যপুস্তকের কাজ সম্পন্ন, শ্রেণি কাজে সক্রিয়তা, ভাষা ও বিষয়বস্তুর দক্ষতা এবং ক্লাস টেস্ট করা হবে। সামষ্টিক মূল্যায়নে লিখিত ও ব্যবহারিক পরীক্ষা রাখা হয়েছে। প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে ৫০ শতাংশ ধারাবাহিক মূল্যায়ন ও ৫০ শতাংশ সামষ্টিক মূল্যায়ন করা হবে। তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণিতে ৩০ শতাংশ ধারাবাহিক মূল্যায়ন ও ৭০ শতাংশ সামষ্টিক মূল্যায়ন করতে বলা হয়েছে।
প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে বাংলা, ইংরেজি ও গণিত বিষয়ে যথাক্রমে লিখিত ৩৫, ৩০ ও ৪০ নম্বর এবং ব্যবহারিক পরীক্ষা হিসেবে ১৫, ২০ ও ১০ নম্বর রাখা হয়েছে। এই তিন বিষয়ে ২ ঘণ্টা লিখিত পরীক্ষা ও ২ ঘণ্টা মৌখিক ও ব্যবহারিক পরীক্ষা নেওয়ারও পরিকল্পনা রয়েছে মন্ত্রণালয়ের। শিক্ষাবিদরা বলছেন, প্রাথমিকের প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীদের একটি বিষয়ের জন্য ৪ ঘণ্টার পরীক্ষা নেওয়া মানে শিক্ষার্থীদের মনের ওপর তীব্র চাপ তৈরি করা। আরও সহজে মূল্যায়নের সুযোগ রয়েছে। কিন্তু কেন এমন জটিল ব্যবস্থা করা হচ্ছে, এর পেছনে কার স্বার্থ রয়েছে তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে।
নতুন ধারাবাহিক মূল্যায়নের নম্বর বণ্টন নির্দেশিকায় দেখা যায়, প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির জন্য পাঠ্যপুস্তক ও শিক্ষক সহায়িকার কাজ সম্পন্ন করার জন্য বাংলা, ইংরেজি ও গণিতে ২০ নম্বর রাখা হয়েছে। শ্রেণিকাজে সক্রিয়তার জন্য আরও ৫ নম্বর পাবে শিক্ষার্থীরা। ভাষাগত দক্ষতায় ১০ নম্বর, ক্লাস টেস্টে ১৫ নম্বর রয়েছে। বাদ হওয়া নতুন কারিকুলামের মতো মূল্যায়নের তথ্য সংরক্ষণ, শিখন অগ্রগতির প্রতিবেদন, পরবর্তী শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হতে হলে অন্তত ৪০ পয়েন্ট অর্জন করার কথাও বলা হয়েছে।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক এবং প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন কমিটির প্রধান মনজুর আহমদ জনকণ্ঠকে বলেন, আবারও পরীক্ষাকে বড় করে দেখা হচ্ছে, ভালো পড়াশোনার চেয়ে। যাদের সঙ্গে আলোচনা করার লম্বা তালিকা দেওয়া হয়েছে তারা শিক্ষার্থী মূল্যায়ন বিশেষজ্ঞ নন, এ ব্যাপারে আন্তর্জাতিক গবেষণার ধারণা হয়ত তাদের নেই। তারা মনগড়া গতানুগতিক কথা বলছেন। এরা (আমলারা) বলেন, শিক্ষার্থীদের পরীক্ষামুখী করতে হবে। পাঠমুখী বা শিক্ষামুখী বলেন না। বর্তমানে যা ছিল তার এত পরিবর্তন না করে পাঠদান উন্নয়নে জোর দেওয়া দরকার ছিল। ১ম ও ২য় শ্রেণিতে প্রান্তিক পরীক্ষার দরকার ছিল না। বারবার পরিবর্তন সকলকে উদ্বিগ্ন করে, বিশেষত যখন নতুন নিদের্শ বাস্তবায়ন কিভাবে হবে বা ফল কী হবে জানা নেই।

