ডেইলি নারায়ণগঞ্জ টুয়েন্টিফোর ডটকমঃ চায়ের দেশে এখন ক্রিকেট উৎসবের আমেজ। সিলেট আন্তর্জাতিক স্টেডিয়ামে উত্তাপ ছড়াচ্ছে বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লীগ (বিপিএল)। এবারের আসরটি একজনের জন্য বিশেষ। তিনি মঈন আলী। ক্রিকেট বিশ্ব দাপিয়ে বেড়ানো এই ইংলিশ অলরাউন্ডার সিলেটে কেবলই একজন বিদেশি ক্রিকেটার নন, তিনি এখানকার ‘জামাই’। গ্যালারির গর্জন তাকে টানে চুম্বকের মতো, কারণ তিনি জানেন এই গর্জনের মাঝে মিশে আছে আত্মীয়তার টান। ভিনদেশি তারকা হয়েও তিনি মিশে গেছেন এই লাল মাটির গন্ধে। শ্বশুরবাড়ির শহরে খেলতে পেরে তিনিও দারুণ উচ্ছ্বসিত। এখানকার মানুষ, সংস্কৃতি কিংবা সামাজিক সম্পর্ক- সবই তার চেনা। তিনি জানেন ‘দুলাভাই’ বা ‘জামাই’ ডাকের গভীরতা এবং এর পেছনের ভালোবাসা। স্থানীয় মানুষের এই অকৃত্রিম আবেগ তাকে মুগ্ধ করে বারবার। নিজের দল সিলেট টাইটানসের হয়ে মাঠ মাতাতে তাই বাড়তি অনুপ্রেরণা কাজ করে তার মধ্যে। ঘরের মাঠে খেলার অনুভূতি সব সময়ই অন্যরকম, আর সেই ঘর যদি হয় আত্মীয়তার বন্ধনে বাঁধা, তবে তা হয়ে ওঠে আরও উপভোগ্য। দর্শকদের চিৎকার আর প্রত্যাশার চাপ- সব মিলিয়ে এক দারুণ অভিজ্ঞতার মধ্যদিয়ে যাচ্ছেন তিনি। এই ভালোবাসার প্রতিদান দিতে চান ব্যাটে-বলে। নিজের এই গভীর অনুভূতির কথা প্রকাশ করতে গিয়ে মঈন আলী বলেন, ‘দুলাভাই, জামাই এগুলো মানে কী সেটা সম্পর্কে আমি জানি। আমি সারাজীবন বাংলাদেশিদের সঙ্গে বেড়ে উঠেছি। যেটা বললাম সিলেটে খেলা এবং সিলেটের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করা সবসময়ই ভালো লাগে।’ ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের জগৎটা বড্ড অদ্ভুত আর সদা পরিবর্তনশীল। এখানে আবেগের চেয়ে পেশাদারিত্ব আর সময়ের হিসাবটাই মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়। তবে কখনো কখনো বাস্তবতা কঠিন হয়ে দাঁড়ায় এবং খেলোয়াড়দের জন্য পীড়াদায়ক হয়। যেমনটা হয়েছে বাংলাদেশের পেসার মোস্তাফিজুর রহমানের ক্ষেত্রে। বিশ্বজুড়ে সমাদৃত এই পেসারকে নিয়ে সৃষ্ট সাম্প্রতিক জটিলতা ছুঁয়ে গেছে মঈনকেও। একটা ভালো চুক্তি পেয়েও টাইমিংয়ের ফেরে মোস্তাফিজের ভোগান্তি বা বিপিএল খেলতে না পারার বিষয়টি পোড়াচ্ছে তাকে। অন্যদিকে বিদেশি তারকারা আসছেন আবার চলে যাচ্ছেন। যেমন মোহাম্মদ আমির চলে গেছেন লীগ শেষ না করেই। তবে এসব বিতর্ক এড়িয়ে মঈনের চোখ শুধুই জয়ে। মোস্তাফিজের প্রসঙ্গে গভীর সহানুভূতি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এটা একটা লজ্জার বিষয়, কারণ মোস্তাফিজ সত্যিই খুব ভালো একটা ছেলে। সে তার ক্যারিয়ারের দীর্ঘ একটা সময় কঠোর পরিশ্রম করেছে এবং অবশেষে একটা ভালো চুক্তি পেয়েছিল। তাই টাইমিংটা ভুল হওয়ায় তার সঙ্গে এমনটা হওয়া দুঃখজনক।’
তারকা সংকট ও সমাধান
বাংলাদেশের ক্রিকেটে নক্ষত্রপতনের হাহাকার বেশ পুরনো। সাকিব-তামিম পরবর্তী যুগে হাল ধরবেন কে? এমন প্রশ্নে মঈনের বাজি তরুণ লেগ স্পিনার রিশাদ হোসেন। আধুনিক ক্রিকেটে রিস্ট স্পিনাররা জাদুকর হিসেবে পরিচিত। রিশাদের মাঝে সেই জাদুর ছোঁয়া দেখতে পান অভিজ্ঞ এই ইংলিশ অলরাউন্ডার। বিগ ব্যাশের মতো বড় মঞ্চে খেলার সুযোগ রিশাদকে আরও ধারালো করবে বলে বিশ্বাস তার। বিপিএলে রিশাদকে মিস করাটা টুর্নামেন্টের জন্য দুর্ভাগ্যজনক হলেও, বৃহত্তর স্বার্থে এবং খেলোয়াড়ের ব্যক্তিগত উন্নতির জন্য এটাকে ইতিবাচকভাবেই দেখছেন মঈন। তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয় সে বাংলাদেশের পরবর্তী বড় সুপারস্টার হতে যাচ্ছে। সে একজন চমৎকার বোলার এবং নিজের একটা নাম তৈরি করছে।’ সময়ের ফ্রেমে বদলে গেছে বাংলাদেশের ক্রিকেট। পরিসংখ্যান হয়তো উন্নতির কথা বলে, অবকাঠামো বেড়েছে। কিন্তু মঈন আলী খুঁজছেন সেই পুরনো বারুদ। একসময় তামিম ইকবাল বা সাকিব আল হাসানের মতো বিশ্বমানের লড়াকু ক্রিকেটার ছিল দলে। যারা ছিলেন একপেশে ম্যাচেও জয়ের আশা, যাদের উপস্থিতিই প্রতিপক্ষের মনে ভয় ধরাত। বর্তমান দলে প্রতিভাবান খেলোয়াড়ের অভাব নেই। কিন্তু সেই ‘সুপারস্টার’ সুলভ ব্যক্তিত্ব বা মানসিক কাঠিন্যের বড়ই অভাব পরিলক্ষিত হয়। জেনুইন খেলোয়াড় বাড়লেও বিশ্বমানের ক্যারেক্টার কমেছে। বড় মঞ্চে এই মানসিক ধীরতাই পার্থক্য গড়ে দেয়। দুই প্রজন্মের তুলনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘এখনকার দলে সত্যিকার অর্থেই ভালো খেলোয়াড় অনেক বেশি, কিন্তু একটা নির্দিষ্ট লেভেলের সুপারস্টার বা ওই মানসিক দৃঢ়তার কিছুটা অভাব আছে। বাংলাদেশ ক্রিকেটের উন্নতি হয়েছে, কিন্তু মানসিক দিক থেকে হয়তো মাঝে মাঝে পিছিয়ে পড়ে।’
সাফল্যের কোনো সংক্ষিপ্ত পথ নেই, নেই কোনো জাদুর কাঠি। নিজের ক্যারিয়ার দিয়েই সেটা প্রমাণ করেছেন মঈন। একসময়ের মিডিয়াম পেসার থেকে পিঠের চোটের কারণে হয়ে ওঠেন ফিঙ্গার স্পিনার। তারপর শুধুই কঠোর পরিশ্রমের গল্প। ভাগ্য হয়তো সুযোগ করে দিয়েছে, কিন্তু টিকে ছিলেন ঘামের বিনিময়ে। তাই উত্তরসূরিদের জন্য তার একটাই পরামর্শ- পরিশ্রম। রিশাদ বা অন্য তরুণদের অলরাউন্ডার হয়ে উঠতে হলে ব্যাটিং-বোলিং দুটিতেই সমান শ্রম দিতে হবে। বিশ্বজুড়ে লীগ খেলে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করতে হবে। শেখার আগ্রহটাই গড়ে দেবে আগামীর পথ। তরুণদের পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, ‘কঠোর পরিশ্রম করতে হবে। ব্যাটিংয়ে আরও খাটতে হবে। বোলিংয়েও পরিশ্রম চালিয়ে যেতে হবে। শেখার চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। কঠোর পরিশ্রমের কোনো বিকল্প নেই।’

