ডেইলি নারায়ণগঞ্জ টুয়েন্টিফোর ডটকমঃ আপনি হয়তো নিজের রক্তের গ্রুপ জানেন রক্তদানের কার্ডে লেখা একটি তথ্য হিসেবেই। কিন্তু বিজ্ঞান বলছে, এই ছোট তথ্যটি নীরবে আপনার শরীরের বড় একটি ঝুঁকির ইঙ্গিত বহন করতে পারে। সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক গবেষণাগুলো সতর্ক করে দিচ্ছে একটি নির্দিষ্ট রক্তের গ্রুপের মানুষের ক্ষেত্রে পাকস্থলীর ক্যান্সারের আশঙ্কা তুলনামূলকভাবে বেশি। গবেষকদের নজরে যে রক্তের গ্রুপটি সবচেয়ে বেশি এসেছে, সেটি হলো রক্তের গ্রুপ ‘এ’।
এই সতর্কবার্তা কোনো বিচ্ছিন্ন পর্যবেক্ষণের ফল নয়। দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন দেশের হাসপাতাল, ক্যান্সার রেজিস্ট্রি ও স্বাস্থ্যতথ্য বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা একটি ধারাবাহিক প্রবণতা লক্ষ্য করেছেন। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন জার্নাল ‘নেচার’-এ প্রকাশিত বৃহৎ পরিসরের পিয়ার-রিভিউড গবেষণায় দেখা গেছে, রক্তের গ্রুপ এ-এর মানুষদের পাকস্থলীর ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার হার রক্তের গ্রুপ ও-এর তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। গবেষকদের মতে, এর পেছনে রয়েছে রক্তের গ্রুপ এ-এর অ্যান্টিজেনের জৈবিক আচরণ, যা পাকস্থলীর কোষে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
পাকস্থলীর ক্যান্সার কখনোই একক কারণে হয় না। খাদ্যাভ্যাস, ধূমপান, অতিরিক্ত লবণযুক্ত খাবার, সংক্রমণ এবং পরিবেশগত নানা উপাদান একসঙ্গে কাজ করে। তবুও এসব বিষয় সমন্বয় করে বিশ্লেষণ করার পরও গবেষণায় দেখা গেছে, রক্তের গ্রুপ এ একটি সূক্ষ্ম কিন্তু স্থায়ী ঝুঁকির উপাদান হিসেবে রয়ে যাচ্ছে। ঝুঁকিটি হঠাৎ বা নাটকীয় নয়, বরং ধীরে ধীরে বছরের পর বছর ধরে কাজ করে যা একে আরও বেশি গুরুত্বের সঙ্গে দেখার কারণ তৈরি করে।
অনেকেরই অজানা, রক্তের গ্রুপের অ্যান্টিজেন কেবল রক্তেই সীমাবদ্ধ নয়। পাকস্থলীর কোষের পৃষ্ঠেও এই অ্যান্টিজেন উপস্থিত থাকে। রক্তের গ্রুপ এ-এর ক্ষেত্রে এই অ্যান্টিজেন পাকস্থলীর কোষগুলোর প্রতিক্রিয়ায় সামান্য পরিবর্তন আনতে পারে। পাকস্থলীর অ্যাসিড, বারবার জ্বালা বা ক্ষতির মুখে পড়লে কোষ নিজেকে যে প্রক্রিয়ায় ঠিক করে নেয়, সেখানে বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা থাকে। দীর্ঘদিন ধরে এই ক্ষতি ও মেরামতের চক্র চলতে থাকলে কোষে ত্রুটি জমা হতে পারে, যা একসময় ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
পাকস্থলীর ক্যান্সারের অন্যতম শক্তিশালী ঝুঁকিপূর্ণ কারণ হলো হেলিকোব্যাকটার পাইলোরি সংক্রমণ। বহু মানুষ এই ব্যাকটেরিয়া শরীরে বহন করলেও কোনো উপসর্গ টের পান না। গবেষণায় দেখা গেছে, রক্তের গ্রুপ এ-এর মানুষের পাকস্থলীর কোষে এই ব্যাকটেরিয়া তুলনামূলকভাবে সহজে লেগে থাকতে পারে। ফলে সংক্রমণ দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং নিঃশব্দ প্রদাহ বছরের পর বছর ধরে চলতে থাকে, যা ক্যান্সারের পথ তৈরি করতে পারে।
এর বিপরীতে, জনসংখ্যাভিত্তিক গবেষণায় রক্তের গ্রুপ ও-এর মানুষের মধ্যে পাকস্থলীর ক্যান্সারের হার তুলনামূলকভাবে কম পাওয়া গেছে। পাকস্থলীর কোষে এ বা বি অ্যান্টিজেন না থাকায় ব্যাকটেরিয়ার সংযুক্তি ও প্রদাহের ধরন ভিন্ন হতে পারে বলে গবেষকদের ধারণা। যদিও এটি সম্পূর্ণ সুরক্ষা দেয় না, তবে ঝুঁকির পার্থক্য বোঝাতে এই তথ্য গুরুত্বপূর্ণ।
চিকিৎসকেরা জোর দিয়ে বলছেন, রক্তের গ্রুপ কখনোই একা নির্ধারণ করে না কে ক্যান্সারে আক্রান্ত হবেন। রক্তের গ্রুপ এ-এর বহু মানুষ সারাজীবন কোনো বড় সমস্যায় পড়েন না, আবার অন্য রক্তের গ্রুপের মানুষও এই রোগে আক্রান্ত হতে পারেন। ধূমপান, অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস, মদ্যপান, দীর্ঘদিনের সংক্রমণ এবং পারিবারিক ইতিহাস ঝুঁকির ক্ষেত্রে অনেক বড় ভূমিকা রাখে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই গবেষণার উদ্দেশ্য ভয় তৈরি করা নয়। বরং সচেতনতা বাড়ানোই মূল লক্ষ্য। রক্তের গ্রুপ এ-এর মানুষদের জন্য এটি একটি সতর্ক সংকেত দীর্ঘদিনের হজমের সমস্যা, পেটব্যথা, গ্যাস্ট্রিক বা অস্বস্তিকে অবহেলা না করার। প্রয়োজনে হেলিকোব্যাকটার পাইলোরি পরীক্ষা ও সময়মতো চিকিৎসা নিলে ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
সব মিলিয়ে গবেষণার সারকথা হলো, রক্তের গ্রুপ এ-এর সঙ্গে পাকস্থলীর ক্যান্সারের ঝুঁকির একটি ধারাবাহিক সম্পর্ক পাওয়া যাচ্ছে, বিশেষ করে রক্তের গ্রুপ ও-এর তুলনায়। রক্তের গ্রুপ ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে না, তবে সচেতনভাবে বিবেচনা করলে এটি রোগ প্রতিরোধ ও আগাম চিকিৎসার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হয়ে উঠতে পারে।

