ডেইলি নারায়ণগঞ্জ টুয়েন্টিফোর ডটকমঃ বিদায়ী বছরটি বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের জন্য ছিল এক অভাবনীয় উত্থান-পতন আর রোমাঞ্চের সংমিশ্রণ। মাঠের লড়াইয়ে লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা কখনো সোনালি সাফল্যে সিক্ত হয়েছেন, আবার কখনো মাঠের বাইরের অস্থিরতা ম্লান করেছে অর্জনের আনন্দ। ফুটবলে মেয়েদের এশিয়া কাপে প্রথমবার উত্তীর্ণ হওয়া আর ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে উত্থান যেমন আশার আলো দেখিয়েছে, তেমনি ক্লাব লাইসেন্সিং ও নিষেধাজ্ঞার জট ফুটবল প্রশাসনকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে। হকিতে আমিরুল ইসলামের বিশ্বরেকর্ড কিংবা আরচারিতে আলিফের সোনা জয় ছিল বছরের সেরা প্রাপ্তি। কিন্তু সংস্কারের নামে ফেডারেশনগুলোতে অস্থিরতা, অলিম্পিক এসোসিয়েশনের বিতর্কিত নির্বাচন এবং নারী অ্যাথলেটদের তোলা যৌন নিপীড়নের অভিযোগ দেশের ক্রীড়া সংস্কৃতির অন্ধকার দিকটিকেও সামনে এনেছে। সবমিলিয়ে ২০২৫ ছিল প্রাপ্তি আর আক্ষেপের এক অম্লমধুর কাব্য।
ফুটবল
বছরটি শুরু হয় অনাকাঙ্ক্ষিত এক বিদ্রোহ দিয়ে। কোচ পিটার বাটলারের বিরুদ্ধে সাবিনা-কৃষ্ণাদের অভিযোগ এবং পরবর্তীতে সিনিয়রদের বাদ পড়া নারী ফুটবলে নতুন মেরুকরণ তৈরি করে। তবে মাঠের পারফরম্যান্সে ইতিহাস গড়েছে মেয়েরা; প্রথমবারের মতো সিনিয়র ও অনূর্ধ্ব-২০ দল এশিয়া কাপের মূল পর্বে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে। জুনে ফিফা র?্যাঙ্কিংয়ে ১০৪ নম্বরে উঠে আসা ছিল নারী ফুটবলের ঐতিহাসিক এক অর্জন। পুরুষ ফুটবলে উন্মাদনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন হামজা চৌধুরী ও শমিত সোম। প্রিমিয়ার লীগ ও কানাডার লীগ মাতানো এই দুই তারকার অভিষেকে দেশের ফুটবলে নজিরবিহীন দর্শক জোয়ার দেখা যায়। তবে কোচ হ্যাভিয়ের ক্যাবরেরার কৌশল এবং ফাহামিদুল ইসলামকে দলে নেয়া নিয়ে সমর্থকদের আন্দোলন ও বিতর্কও ছিল তুঙ্গে। ঘরোয়া ফুটবলে ২২ বছরের খরা কাটিয়ে শিরোপা জেতে মোহামেডান। কিন্তু ক্লাব লাইসেন্সিং জটিলতায় তাদের এএফসি মিশনে নামা হয়নি। অন্যদিকে কিংস ও আবাহনীর মতো বড় ক্লাবগুলো ফিফার নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়ায় আর্থিক শৃঙ্খলার অভাব প্রকট হয়ে ওঠে। বাফুফে তৃণমূল ফুটবলের জন্য এএফসি পুরস্কার পেলেও মাঠের বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। পাইওনিয়ার ও নিম্নস্তরের লীগগুলো নিয়মিত না হওয়ায় তৃণমূলে স্থবিরতা রয়ে গেছে।
প্রথমবারের মতো অনূর্ধ্ব-২১ হকি বিশ্বকাপে অংশ নিয়ে বাজিমাত করে বাংলাদেশ। অস্ট্রেলিয়া-ফ্রান্সের মতো পরাশক্তিদের বিপক্ষে লড়াই করার পর ‘চ্যালেঞ্জার ট্রফি’ জেতে মেহেরাব হোসেন সামিনের দল। আসরে ১৮ গোল করে বিশ্বরেকর্ড গড়েন বাংলাদেশের আমিরুল ইসলাম। যুব হকি বিশ্বকাপের এক আসরে সর্বোচ্চ। ৪ ম্যাচে সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার পান আমিরুল। আলোচনায় ছিল রাসেল মাহমুদ জিমির বাদ পড়া। ফিট থাকা সত্ত্বেও ‘৩২ বছর বয়সের’ অজুহাতে তাকে দল থেকে বাদ দিয়ে সমালোচনার মুখে পড়ে ফেডারেশন। এএইচএফ কাপের অধিনায়ক পুষ্কর ক্ষিসা মিমোকেও পরে দল থেকে বাদ দেয়া হয়। বিগত টানা চার আসরের চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশ এবার এএইচএফ কাপের সেমিফাইনাল থেকে বিদায় নেয়।
কাবাডি
এক দশক পর হওয়া নারী কাবাডি বিশ্বকাপে ব্রোঞ্জ জিতে সামর্থ্যের জানান দিয়েছে বাংলাদেশ। এর আগে এশিয়ান নারী কাবাডি চ্যাম্পিয়নশিপেও ব্রোঞ্জ জিতেছিল লাল সবুজের দল। সাফল্যের এই ধারা অব্যাহত ছিল যুব পর্যায়েও; যুব এশিয়ান গেমসে বালক ও বালিকা উভয় বিভাগেই ব্রোঞ্জ পদক অর্জন করে বাংলাদেশ।
আরচারি
দেশসেরা আরচার রোমান সানার বিদায়ে তৈরি হওয়া শূন্যতা পূরণের আভাস দিয়ে ২০২৫ সালে আলোচনায় আসেন আবদুর রহমান আলিফ। এশিয়া কাপ আরচারির দ্বিতীয় লেগের রিকার্ভ ব্যক্তিগত ইভেন্টে সোনা জিতে ইতিহাস গড়েছেন তিনি। ২০১৯ সালে রোমান সানার পর দ্বিতীয় বাংলাদেশি হিসেবে এশীয় পর্যায়ে এই কীর্তি গড়লেন আলিফ। কেবল আলিফই নন, এশিয়ান আর্চারি চ্যাম্পিয়নশিপেও বাংলাদেশের প্রাপ্তি ছিল নজরকাড়া। হিমু বাছাড় ও বন্যা আক্তারদের হাত ধরে এসেছে রুপা ও ব্রোঞ্জ পদক। এ ছাড়া আরচারির সংগঠক কাজী রাজীবউদ্দিন আহমেদ চপল এশিয়ান আরচারির সভাপতি নির্বাচিত হন।
ব্যাডমিন্টন
ইউনেক্স-সানরাইজ বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল চ্যালেঞ্জ টুর্নামেন্টের মিশ্র দ্বৈতের ফাইনালে উঠে রৌপ্যপদক পায় বাংলাদেশের আল আমিন জুমার-উর্মি আক্তার জুটি। আন্তর্জাতিক আসরে এটিই বাংলাদেশের সেরা সাফল্য। সেই সাফল্যের পালে হাওয়া দিয়ে আন্তর্জাতিক ব্যাডমিন্টন টুর্নামেন্ট থেকে দেশকে প্রথমবার স্বর্ণপদক এনে দেয় আব্দুল জহির তানভীর-গৌরব সিংহ জুটি।
ভলিবল
মালদ্বীপের মালেতে অনুষ্ঠিত কাভা কাপ নারী ভলিবল চ্যাম্পিয়নশিপে আফগানিস্তানকে সরাসরি ৩-০ সেটে হারিয়ে প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক কোনো আসরে ব্রোঞ্জপদক জিতে বাংলাদেশ।
টেবিল টেনিস
ইসলামিক সলিডারিটি গেমসে টেবিল টেনিসে বাংলাদেশ মিশ্র বিভাগে রৌপ্য লাভ করে। জাভেদ আহমেদ ও খৈ খৈ মারমা দেশের হয়ে পদক জেতেন। টেবিল টেনিসে এটি বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সাফল্য।
অন্যান্য
এ বছর দাবায় ওয়াদিফা আহমেদের ‘মহিলা আন্তর্জাতিক মাস্টার’ খেতাব জয় ছিল সবচেয়ে বড় অর্জন। রাণী হামিদ, লিজা ও শিরিনের পর তিনি চতুর্থ বাংলাদেশি হিসেবে এই কীর্তি গড়েন। এ ছাড়া গ্র্যান্ডমাস্টার জিয়াউর রহমানের ছেলে তাহসিন তাজওয়ার আইএম-এর তৃতীয় নর্ম পূর্ণ করেছেন। অন্যদিকে ৫৯ বছর বয়সে জাতীয় চ্যাম্পিয়ন হয়ে চমক দেখিয়েছেন কিংবদন্তি নিয়াজ মোর্শেদ। সৌদি আরবে অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ ইসলামিক সলিডারিটি গেমসে বাংলাদেশের পাঁচ পদকের তিনটিই এসেছে ভারত্তোলন থেকে। ওই গেমসে উশুতে একটি পদক পায় বাংলাদেশ। এ ছাড়া বিদায়ী বছরে সাফ অ্যাথলেটিক্সের রিলেতে দুটি ব্রোঞ্জ পদক পায় বাংলাদেশ। সাতারু সামিউল ইসলাম রাফি মালয়েশিয়ায় আমন্ত্রণমূলক টুর্নামেন্টে স্বর্ণপদক লাভ করেন।
বিতর্ক, সংস্কার
মাঠের সাফল্যের চেয়েও বিদায়ী বছরে দেশের ক্রীড়াঙ্গন বেশি উত্তাল ছিল প্রশাসনিক রদবদল আর অমীমাংসিত বিতর্কে। ৫৫টি ফেডারেশন ও এসোসিয়েশনের কাঠামো ভেঙে সংস্কারের উদ্যোগ নেয়া হলেও তা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে বারবার। সার্চ কমিটির প্রস্তাবনায় ঘুড়ি, প্যারা আরচারি ও কারাতের মতো সংস্থাগুলোকে একীভূত করা হলেও প্রশাসনের সঙ্গে কমিটির দূরত্ব ছিল স্পষ্ট। সবচেয়ে বড় বিতর্কের জন্ম দিয়েছে বাংলাদেশ অলিম্পিক এসোসিয়েশনের (বিওএ) নির্বাচন। স্বার্থের সংঘাতের অভিযোগ তুলে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ চিঠি দিলেও শেষ পর্যন্ত সার্চ কমিটির আহ্বায়ক জোবায়েদুর রহমান রানা মহাসচিব ও সদস্য মেজর (অব.) ইমরোজ আহমেদ সহ-সভাপতি নির্বাচিত হন। অন্যদিকে, ক্রীড়াঙ্গনের অন্ধকার দিকটি উন্মোচিত হয়েছে নারী অ্যাথলেটদের সাহসিকতায়। ক্রিকেটার জাহানারা আলমের প্রতিবাদের পর শুটিং ফেডারেশনের জিএম হায়দার সাজ্জাদের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ আনেন এমা, রত্না ও কলিরা। এই নজিরবিহীন অভিযোগ খতিয়ে দেখতে তদন্ত কমিটি গঠিত হলেও বছরের শেষ নাগাদ আলোর মুখ দেখেনি কোনো প্রতিবেদন।

