ডেইলি নারায়ণগঞ্জ টুয়েন্টিফোর ডটকমঃ হৃদ্রোগ আর বিষণ্নতা যেন অনেক সময় একে অপরের হাত ধরে আসে। ইউরোপীয় সোসাইটি অব কার্ডিওলজির সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, এই দুটি সমস্যার মধ্যে কেবল মানসিক বা সামাজিক সম্পর্ক নয়, রয়েছে গভীর জৈবিক যোগসূত্রও। ফলে একটির প্রভাব অন্যটিকে আরও জটিল করে তোলে এবং আক্রান্ত ব্যক্তির সুস্থ হয়ে ওঠার পথ কঠিন হয়ে যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বাস্তবতা একই সঙ্গে হৃদ্স্বাস্থ্য ও মানসিক স্বাস্থ্যের দ্রুত শনাক্তকরণ ও সমন্বিত চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তাকে আরও জোরালো করে তুলছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের বড় গবেষণা প্রকল্প TO_AITION, যা ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত পরিচালিত হয়েছে, হৃদ্রোগ ও বিষণ্নতার মধ্যে শক্তিশালী সম্পর্কের প্রমাণ দিয়েছে। গবেষকরা দেখেছেন, এই দুটি রোগের পেছনে একই ধরনের প্রদাহজনিত প্রক্রিয়া কাজ করে। বিষণ্নতায় দীর্ঘমেয়াদি হালকা প্রদাহ বেড়ে যায়, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রক্তনালিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।
গবেষণায় উঠে এসেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। হৃদ্রোগে আক্রান্ত প্রতি তিনজনের একজনের মধ্যে বিষণ্নতা দেখা যায় অথবা ভবিষ্যতে তা বিকশিত হয়। এর পেছনে রয়েছে কিছু সাধারণ জিনগত বৈশিষ্ট্য, যা ধমনিতে চর্বির স্তর জমে যাওয়ার প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে। পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে মানসিক চাপের কারণে মস্তিষ্কের প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা অতিসক্রিয় হয়ে পড়ে, যার ফলে হৃদ্স্পন্দনের স্বাভাবিক পরিবর্তন কমে যায় এবং প্রদাহ আরও বাড়ে। ইউরোপীয় সোসাইটি অব কার্ডিওলজির ২০১৯ সালের অবস্থানপত্রের ধারাবাহিকতায় এই নতুন তথ্য হৃদ্রোগ ও বিষণ্নতার জৈবিক সংযোগকে আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে।
বাস্তব জীবনে এর প্রভাব ভয়াবহ। যাদের এই দুটি সমস্যাই রয়েছে, তাদের জীবনমান কমে যায়, হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার হার বাড়ে এবং মৃত্যুঝুঁকিও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। গবেষণা বলছে, বিষণ্নতা হৃদ্রোগীদের মৃত্যুঝুঁকি দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ পর্যন্ত বাড়াতে পারে। আবার হৃদ্রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে বিষণ্নতা থাকলে স্মৃতিশক্তি ও মানসিক সক্ষমতার অবনতি দ্রুত ঘটে। দৈনন্দিন জীবনেও এর নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট। বিষণ্নতার কারণে অনেকেই নিয়মিত ওষুধ খেতে অনীহা দেখান বা ব্যায়াম এড়িয়ে চলেন, অথচ এগুলোই দুই সমস্যার ক্ষেত্রেই উপকারী।
এই প্রেক্ষাপটে ইউরোপীয় সোসাইটি অব কার্ডিওলজির ২০২৫ সালের ক্লিনিক্যাল কনসেনসাস স্টেটমেন্ট হৃদ্স্বাস্থ্য পরীক্ষার সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যের স্ক্রিনিং যুক্ত করার ওপর জোর দিয়েছে। কারণ ক্লান্তি বা বুকব্যথার মতো উপসর্গ অনেক সময় হৃদ্রোগ ও মানসিক সমস্যার ক্ষেত্রে একই রকম হতে পারে। সমন্বিত স্ক্রিনিং পদ্ধতি এই বিভ্রান্তি দূর করে আগেভাগেই ঝুঁকি শনাক্ত করতে পারে, যা বিশ্বজুড়ে নীরবে ভোগা লাখো মানুষের জন্য আশার আলো।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি এক ধরনের দুষ্টচক্র। বিষণ্নতা শরীরে কর্টিসলের মতো স্ট্রেস হরমোন বাড়ায়, যা ধমনিকে শক্ত করে এবং রক্ত জমাট বাঁধার ঝুঁকি বাড়ায়। আবার হৃদ্রোগ থেকে জন্ম নেওয়া দুঃখ ও ভয় বিষণ্নতাকে আরও গভীর করে তোলে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় ঘুমের সমস্যা, যা রক্তচাপ ও রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়িয়ে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, ধূমপান ও জিনগত ঝুঁকিও এই দুই সমস্যাকে একসঙ্গে বাড়িয়ে দেয়।
এই চক্র ভাঙতে ইউরোপীয় সোসাইটি অব কার্ডিওলজি সমন্বিত চিকিৎসা পদ্ধতির কথা বলছে। হৃদ্রোগের ওষুধের পাশাপাশি মানসিক থেরাপি, প্রয়োজনে অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট এবং বিশেষভাবে পরিকল্পিত ব্যায়াম কর্মসূচি একসঙ্গে চালু করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। হার্ট অ্যাটাকের পর বিষণ্নতা মোকাবিলায় কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপি ইতিবাচক ফল দেখাচ্ছে, আর নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম কার্ডিয়াক রিহ্যাবিলিটেশনের মাধ্যমে মন ভালো রাখতে সহায়তা করছে।
TO_AITION প্রকল্প ভবিষ্যতের চিকিৎসায় নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে এমন কিছু কার্যকর উদ্যোগও প্রস্তাব করেছে। প্রদাহ শনাক্তকারী রক্তপরীক্ষা, মানসিক অবস্থা ও শারীরিক সূচক একসঙ্গে পর্যবেক্ষণকারী অ্যাপ এবং ব্যক্তিগত ঝুঁকি নির্ধারণভিত্তিক পরিকল্পনা চিকিৎসকদের সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ করতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ছোট পরিবর্তন থেকেই শুরু করা যায়। নিয়মিত হাঁটা, ওমেগা-৩ সমৃদ্ধ স্বাস্থ্যকর খাবার এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে সচেতন অনুশীলন হৃদ্যন্ত্র ও মনের জন্যই নিরাপদ। কার্ডিওলজিস্ট ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা একমত যে নিয়মিত স্ক্রিনিং এই দুই সমস্যার ক্ষেত্রেই জীবনরক্ষাকারী ভূমিকা রাখতে পারে। হৃদ্স্বাস্থ্য ও মানসিক স্বাস্থ্যকে একসঙ্গে বিবেচনায় আনার মধ্যেই রয়েছে উন্নত চিকিৎসা ও সুস্থ ভবিষ্যতের চাবিকাঠি।

