ডেইলি নারায়ণগঞ্জ টুয়েন্টিফোর ডটকমঃ লিভার ক্যান্সারের চিকিৎসায় নতুন আলো দেখিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ডেলাওয়ারের গবেষকরা। তারা পেয়ারা গাছ থেকে প্রাপ্ত এক বিশেষ অণুর বিকল্প রাসায়নিক পথ উদ্ভাবন করেছেন, যা ভবিষ্যতে সাশ্রয়ী ও কার্যকর লিভার ক্যান্সারের ওষুধ তৈরিতে ব্যবহৃত হতে পারে।
প্রকৃতির দানকে ল্যাবরেটরিতে জীবন্ত করা
গবেষণার নেতৃত্বে ছিলেন রসায়ন ও জৈব রসায়ন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক উইলিয়াম চেইন। তাদের ‘ন্যাচারাল প্রোডাক্ট টোটাল সিনথেসিস’ প্রযুক্তির মাধ্যমে অল্প খরচে পেয়ারা-জাতীয় জটিল অণু পুনর্গঠন সম্ভব হয়েছে। গবেষকরা মনে করেন, এই উদ্ভাবন লিভার ক্যান্সারের মতো ব্যয়বহুল রোগের চিকিৎসা বিশ্বব্যাপী লাখো মানুষের নাগালে পৌঁছে দিতে পারে।
প্রকৃতি দীর্ঘদিন ধরেই আধুনিক চিকিৎসার অমূল্য উৎস। যেমন উইলো গাছের ছাল থেকে তৈরি সালিসিন পরিণত হয় অ্যাসপিরিনে, তেমনি অগণিত উদ্ভিদজাত যৌগ আধুনিক ওষুধের উৎস। কিন্তু বড় পরিসরে সংগ্রহ সীমাবদ্ধতা সৃষ্টি করতো। ডেলাওয়ারের গবেষকরা তা কাটিয়ে উঠেছেন, পরীক্ষাগারে সহজলভ্য রাসায়নিক ব্যবহার করে পেয়ারার অণু পুনর্গঠন করে। ফলে এখন পর্যাপ্ত পরিমাণে উৎপাদন সম্ভব, যা ভবিষ্যতে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের জন্য প্রস্তুত।
লিভার ক্যান্সারের বিরুদ্ধে পেয়ারার সম্ভাবনা
গবেষক দলটি যে অণুটি চিহ্নিত করেছে, তা লিভার ও পিত্তনালীর ক্যান্সারের চিকিৎসায় অসাধারণ প্রতিশ্রুতি দেখাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ এই ক্যান্সারে আক্রান্ত হন, বিশেষ করে দেরিতে শনাক্ত হলে পাঁচ বছরের বেঁচে থাকার হার মাত্র ১৫ শতাংশের কম। পরীক্ষাগারে তৈরি অণুটি দ্রুত ও কার্যকরভাবে ক্যান্সারের বিরুদ্ধে কীভাবে কাজ করে, তা যাচাই করা হচ্ছে, যা বিদ্যমান ওষুধের সঙ্গে মিলিয়ে নতুন চিকিৎসা পদ্ধতির পথ খুলে দেবে।
সাশ্রয়ী চিকিৎসার নতুন দিগন্ত
সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এটি অত্যন্ত কম খরচে উৎপাদনযোগ্য। উইলিয়াম চেইন বলেন, “আমরা যে ওষুধগুলো ব্যবহার করি, তার অধিকাংশই প্রাকৃতিক উৎস থেকে এসেছে। কিন্তু সীমিত প্রাকৃতিক সম্পদের কারণে চাহিদা পূরণ করা কঠিন। আমাদের পদ্ধতিতে এখন ল্যাবরেটরিতেই অণুগুলো তৈরি সম্ভব।” এর ফলে উন্নয়নশীল দেশগুলোতেও লিভার ক্যান্সারের সাশ্রয়ী চিকিৎসা সম্ভব হবে।
বৈশ্বিক আগ্রহ ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
গবেষণার প্রকাশের পর আন্তর্জাতিক স্তরে ব্যাপক সাড়া পড়েছে। প্রথম লেখক ডক্টরাল শিক্ষার্থী লিয়াম ও’গ্রেডি বলেন, “আমরা অজানা পথে প্রথম পদক্ষেপ নিয়েছি। অন্যরা এখন আরও সহজ উপায় খুঁজে বের করতে পারবে।” বর্তমানে দলটি যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ক্যানসার ইনস্টিটিউটের সঙ্গে কাজ করছে, যাতে দেখা যায় পেয়ারা-জাত অণুটি অন্যান্য ক্যান্সারের ক্ষেত্রেও কার্যকর কিনা।
ভবিষ্যতের চিকিৎসায় নতুন আশা
বিশ্বজুড়ে লিভার ও পিত্তনালীর ক্যান্সারের প্রকোপ বাড়ছে। ব্যয়বহুল চিকিৎসা এবং কম বেঁচে থাকার হার বহু রোগীর জন্য ভয়ানক বাস্তবতা তৈরি করেছে। ডেলাওয়ারের এই আবিষ্কার শুধুমাত্র চিকিৎসার খরচ কমাবে না, বিশ্বব্যাপী রোগীদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনাও বাড়াবে।
গবেষকরা মনে করেন, প্রকৃতির অনুপ্রেরণাই আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভবিষ্যৎ পথপ্রদর্শক। পেয়ারার মতো পরিচিত একটি ফল থেকেই ক্যান্সারের ওষুধের উপাদান আবিষ্কৃত হলে চিকিৎসা বিজ্ঞানের সামনে সত্যিই নতুন যুগের সূচনা হতে যাচ্ছে।

