কর্মসংস্থানমুখী নীতি-কৌশল প্রণয়ন করার তাগিদ
ডেইলি নারায়ণগঞ্জ টুয়েন্টিফোর ডটকমঃ বেকারত্ব দূরীকরণে কর্মসংস্থানমুখী নীতি-কৌশল প্রণয়ন করার তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে কম-বেশি প্রবৃদ্ধির ধারা বজায় থাকার পরও তা নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করছে না, উল্টো চাকরির বাজার ছোট হচ্ছে। শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে চাকরির বাজারের কোনো সংযোগ নেই। শাসন ব্যবস্থাও এমন যে, তারা এসব দুর্বলতাকে চিহ্নিত করে তা কাটিয়ে ওঠার মতো প্রজ্ঞা দেখাতে ধারাবাহিক ব্যর্থতার পরিচয় দিয়ে যাচ্ছে। এ ব্যর্থতার চক্র ভেঙে আগামী অন্তত ১৫ বছর দেশের নীতি-কৌশল পুরোপুরি কর্মসংস্থান সৃষ্টিকেন্দ্রিক হতে হবে। সম্প্রতি ‘বেকারত্বহীন প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানকেন্দ্রিক নীতি কাঠামো’ শীর্ষক সেমিনারে এমন পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন অর্থনীতিবিদ ও গবেষকরা।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের উন্নয়ন নিয়ে একটি আত্মতুষ্টি ছিল, যা সম্প্রতি অনেকটাই ভুল প্রমাণিত হয়েছে। তিনি বলেন, উন্নয়ন, কর্মসংস্থান ও দারিদ্র্য হ্রাস নিয়ে রাষ্ট্র, সমাজ ও নাগরিক সমাজের বিশ্লেষকরাও এক ধরনের আত্মতুষ্টিতে ভুগছিলেন।
তবে সাম্প্রতিক গবেষণাগুলো এই আত্মতুষ্টি ভেঙে দিয়েছে। ২০১৬-২০২২ সময়ে বাংলাদেশ দুর্নীতিপরায়ণ ও সম্পদশালীদের স্বার্থনির্ভর ভিশাস ট্রায়াঙ্গেলে (দুষ্টচক্রে) আটকে পড়ে, যেখানে কর্মসংস্থানবিমুখ প্রবৃদ্ধি, উপেক্ষিত বৈষম্য এবং বিকৃত শাসন ব্যবস্থাই ছিল প্রধান বৈশিষ্ট্য। তিনি বলেন, পিপিআরসি ও বিশ্বব্যাংকের গবেষণা বলছে, ২০২২ সাল থেকে দেশে দারিদ্র্য আবার বাড়ছে। একইসঙ্গে ইউনিসেফ ও বিবিএসের তথ্য দেখাচ্ছে, শিশু বিয়ে, প্রজনন হার ও সামাজিক সূচকেও অবনতি হয়েছে। নারী শ্রমশক্তি কমে যাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, পরিসংখ্যান নয়, গল্পটা বের করতে হবে- নারীরা কেন কর্মসংস্থান ছাড়ছেন। নিরাপদ পরিবহন হলে অনেক নারী চাকরি করতে আগ্রহী হবে।
শ্রমবাজার, শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন নীতিতে বড় ধরনের ব্যর্থতা ছিল মন্তব্য করে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মো. সানোয়ার জাহান ভূঁইয়া বলেন, এটা জাতীয় ব্যর্থতা। আমাদের শিল্পনীতি, কর্মসংস্থান নীতি, শিক্ষানীতি ও দক্ষতা উন্নয়ন নীতির মধ্যে কোনো সমন্বয় নেই, যা বর্তমান সংকটকে আরও তীব্র করেছে। ওই অনুষ্ঠানে আইএলও বাংলাদেশ অফিসের নতুন কান্ট্রি ডিরেক্টর ম্যাক্স টুনন বলেন, এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয় বেসরকারি খাতের চাহিদা অনুযায়ী বাজারভিত্তিক দক্ষতা উন্নয়ন এবং মানসম্মত, অন্তর্ভুক্তিমূলক চাকরি তৈরি। মূল প্রবন্ধে ড. এম এ রাজ্জাক বলেন, বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির ধরন এমন যে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হয় না; বরং সংকুচিত হয়। তিনি বলেন, ২০১৩ থেকে ২০২৩ সময়ে জিডিপিতে কৃষি খাতের অংশ প্রায় সাড়ে ১৫ শতাংশ থেকে কমে ১১ শতাংশে নেমেছে এবং শিল্প খাতের অংশ ২৫ থেকে বেড়ে ৩৪ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।
অথচ কৃষিতে শ্রম কমেনি, উল্টো উৎপাদন শিল্পে কর্মসংস্থান ৯৫ লাখ থেকে ৮১ লাখে নেমেছে। ২০১০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে প্রস্তুত তৈরি পোশাক রপ্তানি সাড়ে ১২ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ৪০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছালেও কর্মসংস্থান ৪০ লাখের আশপাশেই স্থির রয়েছে।
২০১৬ থেকে ২০২০ সময়ে দেশে বছরে গড়ে প্রায় ১২ লাখ নতুন চাকরি তৈরি হলেও, প্রয়োজন ছিল ২২ লাখ নতুন কর্মসংস্থান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য ড. সায়মা হক বিদিশা বলেন, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি নির্ভর করে উৎপাদনশীলতা, দক্ষতার সমন্বয় ও শ্রম অধিকার সুরক্ষার ওপর। বিডিজবসের সিইও ফাহিম মাসরুর বলেন, ২০১০ সালে যেখানে বছরে সাড়ে তিন লাখ স্নাতক চাকরিবাজারে প্রবেশ করত, এখন তা ১০ লাখ। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন কলেজগুলো বেকারত্ব সৃষ্টির কারখানায় পরিণত হয়েছে। বিলসের নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ বলেন, শিল্প খাত নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করতে না পারলেও সেবা খাত পারে। আমাদের সেভাবে কৌশল নেওয়া দরকার। কিন্তু কৌশল প্রণয়নে নীতির সংযোগ থাকে না।

