ডেইলি নারায়ণগঞ্জ টুয়েন্টিফোর ডটকমঃ কিডনিতে পাথর একবার হলে যন্ত্রণা, উৎকণ্ঠা আর দৈনন্দিন জীবনের ছন্দ নষ্ট হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু সমস্যা এখানেই শেষ নয়। একবার যাঁদের হয়েছে, তাঁদের অনেকের মধ্যেই আবার হওয়ার আশঙ্কা কাজ করে। বয়সভেদে কিডনি স্টোনের ঘটনা বাড়তে থাকায় এই ভয়ও দিন দিন বিস্তৃত হচ্ছে। চিকিৎসা গবেষণায় দেখা গেছে, কিডনিতে পাথর গঠনের পেছনে নানা কারণ থাকলেও পুনরাবৃত্তির বড় একটি অংশ জড়িত জীবনযাপনের অভ্যাসের সঙ্গে।
প্রস্রাব অতিরিক্ত ঘন হয়ে গেলে বা শরীরে কিছু খনিজের মাত্রা বেড়ে গেলে ক্ষুদ্র স্ফটিক তৈরি হয়, যা ধীরে ধীরে পাথরে রূপ নেয়। সুখবর হলো, এখন এসব প্রক্রিয়া সম্পর্কে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ধারণা অনেক স্পষ্ট। ফলে সঠিক চিকিৎসা সহায়তা ও কিছু সহজ দৈনন্দিন অভ্যাস গড়ে তুললে কিডনিতে পাথর হওয়ার ঝুঁকি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
পুনরাবৃত্ত কিডনি স্টোন সাধারণত প্রস্রাব ঘন হয়ে যাওয়া বা শরীরে নির্দিষ্ট খনিজের অতিরিক্ত উৎপাদনের ফল। জীবনযাপনে সামান্য পরিবর্তন এনে এই ভারসাম্য ঠিক করা যায়। কারও ক্ষেত্রে ওষুধ প্রয়োজন হতে পারে, তবে বেশির ভাগ সময়ই অভ্যাসগত পরিবর্তন বড় ভূমিকা রাখে। পর্যাপ্ত পানি পান, লবণ কমানো, খাদ্যে ক্যালসিয়ামের সঠিক মাত্রা বজায় রাখা, অতিরিক্ত মাংস কম খাওয়া, বেশি ফল ও সবজি খাওয়া এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ গ্রহণ এসব পদক্ষেপ একসঙ্গে কাজ করে কিডনিকে সুরক্ষিত রাখে।
প্রথম এবং সবচেয়ে কার্যকর অভ্যাস হলো সারাদিনে পর্যাপ্ত পানি পান করে প্রস্রাব পাতলা রাখা। পুনরাবৃত্ত কিডনি স্টোন বিষয়ে আমেরিকান কলেজ অব ফিজিশিয়ান্সের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, বেশি তরল গ্রহণ করলে প্রস্রাব পাতলা হয় এবং খনিজের ঘনত্ব কমে যায়। এতে স্ফটিক তৈরির সুযোগ কমে। অনেকেই দিনে এক বা দুইবার বেশি পানি পান করেন, কিন্তু মাঝখানে দীর্ঘ সময় পানিশূন্য থাকেন। এতে আবার প্রস্রাব ঘন হয়ে ওঠে। তাই অল্প অল্প করে নিয়মিত পানি পান করাই সবচেয়ে উপকারী। ধারাবাহিকভাবে পানি পান কিডনির স্বাভাবিক কার্যকারিতা বজায় রাখে এবং পাথর বড় হওয়ার ঝুঁকি কমায়।
দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ অভ্যাস হলো লবণ কমানো। অতিরিক্ত লবণ খেলে কিডনি প্রস্রাবের মাধ্যমে বেশি ক্যালসিয়াম বের করে দেয়, যা ক্যালসিয়ামভিত্তিক পাথরের ঝুঁকি বাড়ায়। দৈনন্দিন অনেক খাবারেই অজান্তে বেশি লবণ থাকে, যেমন প্যাকেটজাত স্ন্যাকস, ফাস্টফুড কিংবা রেস্তোরাঁর খাবার। ঘরে রান্না করা সহজ খাবার বেছে নিলে লবণের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হয়। ধীরে ধীরে কম লবণের স্বাদে অভ্যস্ত হওয়া যায়। খাবারের লেবেল পড়া বা ধাপে ধাপে লবণ কমানোর অভ্যাস শরীরে ক্যালসিয়ামের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। সময়ের সঙ্গে এতে মূত্রনালির পরিবেশ পরিষ্কার থাকে এবং পাথর হওয়ার সম্ভাবনাও কমে।
তৃতীয় অভ্যাসটি অনেকের জন্য বিভ্রান্তিকর হলেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তা হলো খাদ্যে পর্যাপ্ত ক্যালসিয়াম নিশ্চিত করা। বিশেষ করে ক্যালসিয়াম অক্সালেট স্টোন প্রতিরোধে এটি কার্যকর। খাবারের ক্যালসিয়াম পরিপাকে অক্সালেটের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়, ফলে অক্সালেট প্রস্রাবের মাধ্যমে কম বের হয়। অনেকেই প্রথমবার পাথর হওয়ার পর ক্যালসিয়ামসমৃদ্ধ খাবার বাদ দেন, ভেবে নেন এতে উপকার হবে। বাস্তবে উল্টোটা ঘটে। ক্যালসিয়াম কম হলে প্রস্রাবে অক্সালেট বেড়ে যায় এবং আবার পাথর হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। দুধ ও অন্যান্য ক্যালসিয়ামসমৃদ্ধ খাবার পরিমিত পরিমাণে খেলে এই ভারসাম্য বজায় থাকে এবং প্রস্রাবের রাসায়নিক গঠন স্বাস্থ্যকর থাকে।
চতুর্থ অভ্যাস হলো অতিরিক্ত মাংস কমানো। বেশি পরিমাণ প্রাণিজ প্রোটিন শরীরে অ্যাসিডের চাপ বাড়ায় এবং ইউরিক অ্যাসিডের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। এতে ইউরিক অ্যাসিড স্টোনের ঝুঁকি যেমন বাড়ে, তেমনি ক্যালসিয়াম স্টোনের আশঙ্কাও থাকে। লাল মাংস, মুরগি ও কিছু সামুদ্রিক মাছ নিয়মিত বা বেশি পরিমাণে খেলে এই ঝুঁকি বাড়তে পারে। সপ্তাহজুড়ে পরিমিতভাবে এসব খাবার গ্রহণ, কিছু খাবারে উদ্ভিদভিত্তিক বিকল্প বেছে নেওয়া কিডনির ওপর চাপ কমায়। এতে প্রস্রাব কম অ্যাসিডিক থাকে এবং পাথর হওয়ার সম্ভাবনা হ্রাস পায়।
পঞ্চম অভ্যাস হিসেবে খাদ্যতালিকায় বেশি ফল ও সবজি যুক্ত করা প্রয়োজন। সাইট্রেট নামের একটি প্রাকৃতিক উপাদান শরীরে স্ফটিক তৈরি হওয়া ঠেকায়। যারা কম ফল ও সবজি খান, তাঁদের সাইট্রেটের মাত্রা সাধারণত কম থাকে, যা পাথর গঠনে সহায়ক হয়। সাইট্রাস ফল ও পটাশিয়ামসমৃদ্ধ সবজি খেলে ধীরে ধীরে সাইট্রেটের মাত্রা বাড়ে এবং প্রস্রাবের পিএইচ স্বাভাবিক থাকে। বড় পরিবর্তনের দরকার নেই। সকালের নাশতায় ফল যোগ করা বা হালকা নাশতায় সবজি বেছে নেওয়ার মতো ছোট পদক্ষেপই সময়ের সঙ্গে কিডনির রাসায়নিক ভারসাম্য উন্নত করে এবং পুনরায় পাথর হওয়ার ঝুঁকি কমায়।
দীর্ঘমেয়াদে কিডনির সুস্থতা নির্ভর করে প্রতিদিনের এসব সিদ্ধান্তের ওপর। এক বা দুটি পরিবর্তন নয়, বরং টেকসই অভ্যাস গড়ে তোলাই মূল চাবিকাঠি। আবহাওয়া, শারীরিক পরিশ্রম ও অন্যান্য স্বাস্থ্যগত অবস্থার ওপর শরীরের পানির চাহিদা ও খনিজ প্রক্রিয়াকরণ নির্ভর করে। যারা বাইরে কাজ করেন বা গরম এলাকায় থাকেন, তাঁদের প্রয়োজনের তুলনায় বেশি পানি লাগতে পারে। আবার কারও ক্ষেত্রে কিছু খাবার প্রস্রাবের রাসায়নিক গঠনে প্রভাব ফেলতে পারে। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, প্রস্রাব পরীক্ষা এবং চিকিৎসকের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করলে কোন অভ্যাস উপকারী আর কোনটি বদলানো দরকার, তা স্পষ্ট হয়। একবার এসব অভ্যাস দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে গেলে কিডনিতে পাথর ফিরে আসার ঝুঁকি কমে এবং দীর্ঘ সময় ধরে কিডনি সুস্থ ও স্থিতিশীল থাকে।

